২০১৮ সালের আগে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল ছিল। এর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে “বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ”-এর ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলো ছিল:
১. কোটা ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা।
২. কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা।
৩. একজন প্রার্থী যেন নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটা সুবিধা নিতে না পারেন।
এরপর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে এর বিস্তার ঘটে রাজধানীসহ সারাদেশে। ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা অবরুদ্ধ হয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করা হয়। এতে দেশের যোগাযোগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়।
আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। একই সময়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় বহু শিক্ষার্থী আহত হন। তবে দমন-পীড়নের পরও আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের সমর্থনে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।
আন্দোলনের তীব্রতা এবং দেশজুড়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণে এগিয়ে আসে। ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, “শিক্ষার্থীরা যখন কোটা চায় না, তখন কোনো কোটাই থাকবে না, সব কোটা বাতিল।”
তবে আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ছিল কোটা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা। এর পরিবর্তে সরকার কোটা সম্পূর্ণ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। জাতীয় সংসদে ঘোষণার পর ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করে। এর মাধ্যমে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে প্রচলিত ৫৬ শতাংশ কোটা বাতিল করে ১০০ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগের ব্যবস্থা চালু করা হয়।
২০১৮ সালে কোটা বাতিলের পর বিষয়টি আবারও আইনি ও রাজনৈতিক পরিসরে ফিরে আসে। ২০২১ সালে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের করা আপিলের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে হাইকোর্ট ২০১৮ সালের পরিপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে এই আন্দোলন একপর্যায়ে দেশব্যাপী ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলন ক্রমেই সংঘাতপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে সরকারি চাকরির কোটা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কোটা নিয়েও পরিবর্তন ও সংকোচন ঘটে। আপিল বিভাগের রায়ে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধাভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত হয়। আদিবাসীদের জন্য কোটা ১ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সমাবেশ থেকে আবারও উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে আদিবাসীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের দাবি ওঠে। এই দাবির যৌক্তিকতা তাই নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।
বিষয়টি শুধু কোটা কত শতাংশ হবে, তা নিয়ে নয়। এর সঙ্গে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বিদ্যমান বৈষম্যের প্রশ্নও জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের দুর্গম অঞ্চলের আদিবাসী শিক্ষার্থীরা এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়াশোনা করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সুযোগের ক্ষেত্রেও তাদের বাস্তবতা ভিন্ন। বিপরীতে ঢাকা ও অন্যান্য শহরের সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলে উভয় পক্ষের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে একই মানদণ্ডে বিচার করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের সব জাতিগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বিসিএসসহ সরকারি চাকরি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রধান ক্ষেত্র। সেখানে কোনো জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি দীর্ঘদিন সীমিত থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নীতি প্রণয়নে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলনও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ভূমি অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত সমস্যাগুলোর অনেকটাই অঞ্চলভিত্তিক। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে তাদের অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণ নীতিনির্ধারণকে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে পারে। একইভাবে উচ্চশিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়লে ভবিষ্যতে শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবী হিসেবে একটি বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বশীল শ্রেণি তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তবে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়। এখানে সমান সুযোগ, ঐতিহাসিক বঞ্চনা এবং বর্তমান প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠী যদি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রাথমিক পর্যায়েই কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকে, তাহলে কেবল সবার জন্য একই প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়াই বাস্তবে সমান ফল নিশ্চিত করে না। এই জায়গা থেকেই বিশেষ ব্যবস্থা বা কোটা নীতির প্রয়োজনীয়তার যুক্তি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, এমন নীতির ক্ষেত্রে কোটার হার, যোগ্যতার মানদণ্ড, সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্র এবং এর মেয়াদ নিয়েও সুস্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন। লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক পদ পূরণ করা নয়। বরং পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে তারা রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোয় আরও কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও এই আলোচনায় বিবেচনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় সামরিক উপস্থিতি ও সামরিক আগ্রাসন এবং সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীরা দেশের সাধারণ অর্থনৈতিক গতিশীলতা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এর প্রভাব শিক্ষা ও কর্মসংস্থান দুই ক্ষেত্রেই পড়েছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও শিক্ষা সহায়ক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য নিজ এলাকা ছেড়ে শহরে আসতে হয়। এতে তাদের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়। ফলে ঢাকা বা অন্যান্য শহরের তুলনামূলকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও প্রস্তুতির সুযোগ সবসময় সমান থাকে না।
এই বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষায় কেবল উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করলে পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আরও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ কোটা বা আসন সংরক্ষণ তাদের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবী হিসেবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পেতে পারে।
একই যুক্তি সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে শহরকেন্দ্রিক শিক্ষা, কোচিং, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রাপ্তির সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এসব সুবিধায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে। ফলে শুধু উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাকে নিয়োগের একমাত্র ভিত্তি করলে বিদ্যমান বৈষম্য পুরোপুরি বিবেচনায় আসে না।
সরকারি প্রশাসনে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্বের আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির মতো বিষয়ে তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রশাসনে তাদের অংশগ্রহণ থাকলে এসব বাস্তবতা নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে উঠে আসার সুযোগ তৈরি হয়। একইভাবে উচ্চশিক্ষায় প্রতিনিধিত্ব বাড়লে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দক্ষ ও প্রতিনিধিত্বশীল পেশাজীবী শ্রেণি গড়ে উঠতে পারে।
তবে কোটা কোনো স্থায়ী বিকল্প অবশ্যই নয়। এর পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা অবকাঠামো, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, শিক্ষক সংকট ও অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতি দূর করতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদে বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভর না করে সমান সুযোগে প্রতিযোগিতা করতে পারে। সেই পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে বিশেষ প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজন, তা নীতিগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
কোটা ব্যবস্থার পক্ষে সাংবিধানিক ভিত্তিও রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র নারী, শিশু কিংবা “নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য” বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে পারবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র চাইলে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। এই বিধানের আলোকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থাকার বাস্তবতা বিবেচনা করে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে।
তবে শুধু সাংবিধানিক সুযোগ থাকলেই কোনো নির্দিষ্ট কোটার কাঠামো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর বা ন্যায্য হয়ে যায় না। এর বাস্তব প্রয়োগ কতটা লক্ষ্যভিত্তিক, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আদিবাসী কোটার একটি বড় সমালোচনা এখানেই। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে এই সুবিধা তুলনামূলকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও শহরকেন্দ্রিক পরিবারের সন্তানরা বেশি পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি কিংবা সমতলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও সুযোগবঞ্চিত আদিবাসী শিক্ষার্থীরা কাঠামোগত কারণে সেই সুবিধা থেকে পিছিয়ে থাকে।
এই সমস্যা সমাধানে কোটার ভেতরেই আরও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন, নন-ক্রিমি লেয়ার নীতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবারকে কোটার সুবিধা থেকে বাদ দিয়ে তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ও সুযোগবঞ্চিত পরিবারের জন্য সুবিধা নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের আয়, অভিভাবকের পেশা, বসবাসের অঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধরন এবং প্রথম প্রজন্মের উচ্চশিক্ষার্থী কি না, এসব বিষয়ও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। এতে কোটা শুধু জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বাস্তব বঞ্চনার ভিত্তিতেও আরও লক্ষ্যভিত্তিক হতে পারে।
এখানে ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের মূল প্রশ্নটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল নিয়োগে মেধার প্রাধান্য নিশ্চিত করা। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধাভিত্তিক রাখার কাঠামো নির্ধারিত হয়। এই বাস্তবতায় আদিবাসীদের জন্য বিশেষ সুবিধার প্রশ্নটি মেধার বিপরীতে দাঁড় করানোর পরিবর্তে কীভাবে ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব ও প্রতিযোগিতার সুযোগের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা যায়, সেটিই মূল আলোচনার বিষয়।
আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত কোটার ওপর স্থায়ী নির্ভরতা তৈরি করা নয়। বরং যে বৈষম্য কোটার প্রয়োজন তৈরি করেছে, সেটিই ধীরে ধীরে দূর করা। পাহাড় ও সমতলের প্রান্তিক অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাড়ানো, দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা, আবাসিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সুবিধা সম্প্রসারণ করা এবং উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্গম অঞ্চলের কলেজ ও বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নও জরুরি।
যদি একজন পাহাড়ি শিক্ষার্থী এবং একজন শহুরে শিক্ষার্থী বাস্তবে একই মানের শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিক্ষক, তথ্য ও প্রস্তুতির সুযোগ পায়, তাহলে তাদের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রও অনেক বেশি সমতাভিত্তিক হবে। সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলে বিশেষ কোটার প্রয়োজনীয়তাও ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। তাই কোটা ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে না দেখে একটি সাময়িক ইতিবাচক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর পাশাপাশি এমন রাষ্ট্রীয় নীতি প্রয়োজন, যা ভবিষ্যতে কোটার প্রয়োজনীয়তাকেই কমিয়ে আনবে।
অর্থাৎ, বিতর্কটি শুধু ৫ শতাংশ কোটা থাকবে কি থাকবে না, এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন একটি জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুযোগের প্রয়োজন হচ্ছে, সেই বৈষম্য কোথায় তৈরি হচ্ছে এবং রাষ্ট্র কীভাবে তা দীর্ঘমেয়াদে দূর করবে। একই সঙ্গে কোটার সুবিধা যেন প্রকৃত সুযোগবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এই দুই দিক একসঙ্গে বিবেচনা করলেই কোটা নিয়ে বিতর্কটি আরও বাস্তবভিত্তিক ও নীতিনির্ভর আলোচনায় পরিণত হতে পারে।
মন্তব্যসমূহ: