Wordsworth-এর চোখে উত্তর-আধুনিক কবিতার সংকট
রোমান্টিক কবিতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ নাম উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ। তাঁর কাছে কবিতা শুধু ছন্দ, অলংকার কিংবা সুন্দর কিছু শব্দের পরপর বিন্যাস নয়। বরং তার মতে, কবিতার উৎস মানুষের জীবনের গভীরে; মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি, প্রকৃতি এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কবিতাকে জন্ম দেয়। তাঁর বিখ্যাত ধারণা, poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings, recollected in tranquility। অর্থাৎ, তীব্র অনুভূতি থেকেই কবিতার জন্ম এবং সেই অনুভূতি সরাসরি কবিতার রূপ লাভ করে না। বরং, স্মৃতি ও চিন্তার মধ্য দিয়ে তা পরিণত হয় কবিতায়।
এই ধারণায় ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে কবিতা ভাষার বিচ্ছিন্ন নির্মাণ নয়। কবিতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসে। একটি দৃশ্য কবিকে স্পর্শ করে, একটি মৃত্যু তাকে নাড়া দেয়, প্রকৃতির মুহূর্তগুলো তার মনে স্থায়ী হয়। পরে সেইসব অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে ফিরে আসে এবং চিন্তা ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে গিয়ে তা নতুন অর্থ পায়। কবিতা তখন শুধু ঘটনার বর্ণনা থাকে না। তা হয়ে ওঠে অনুভুতি ও অভিজ্ঞতার যৌগিক পুনর্গঠন।
এই অবস্থান থেকে উত্তর-আধুনিক কবিতাশৈলীর কিছু প্রবণতার সঙ্গে ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটি মৌলিক দূরত্ব তৈরি হয়। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়সই একক অর্থ, ধারাবাহিকতা, স্থির পরিচয় এবং প্রচলিত কাব্যভাষাকে প্রশ্ন করে। উত্তরাধুনিক কবিরা কবিতার ভাষাকে ভেঙেছেন, বাক্যের স্বাভাবিক বিন্যাস বদলেছেন, অনেকগুলো খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। কখনো কখনো কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে কবিতার নিজেরই ভাষা। এই প্রবণতাগুলোর সাহিত্যিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নিশ্চয় নেই। কিন্তু, ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে, কবিতা যদি নিজের নির্মাণ নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তার মাঝে মানুষের জীবনের জায়গাটি থাকে কোথায়?
ওয়ার্ডসওয়ার্থ সাধারণ মানুষের জীবন, সাধারণের ভাষাকেই কবিতার উপযুক্ত বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছেন, কবিতা কোনো অভিজাত জগতের বিষয় হবে না। বরং, সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ, শিশু, প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু, প্রেম এবং সাধারণ জীবনের ঘটনাগুলোই হবে কবিতার উপাদান। তিনি শুধু মানুষের জীবনকে কবিতায় নিয়ে আসেননি, সেই জীবনের অনুভূতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর মতে, কবিতার ভাষা হবে সহজ, কিন্তু সেই সহজতার ভেতরেই থাকবে অনুভূতির গভীরতা। এককথায় যদি বলি সাধারণের ভাষায় সাধারণের কথা বলে সাধারণের মনে সুখানুভুতি জোগাবে কবিতা; অভিজাত্যের দুর্বোধ্য খোলসে আবদ্ধ হওয়া কবিতার লক্ষ্য নয়।
এই ধারণাটি স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তাঁর We Are Seven কবিতায়। একটি ছোট মেয়েকে কবি জিজ্ঞেস করেন, তার ভাইবোন কয়জন। মেয়েটি বলে, সাতজন। অথচ, তাদের দুজন মারা গেছে। কবি যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝাতে চান, মৃত দুজনকে বাদ দিলে তারা পাঁচজন। কিন্তু মেয়েটি বারবার বলে,
“O Master! we are seven.”
এখানে, Wordsworth যুক্তি ও অনুভূতির মধ্যে একটি গভীর পার্থক্য তৈরি করেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে হয়তোবা মৃত্যু মানে অনুপস্থিতি। কিন্তু, শিশুটির কাছে মৃত্যু মানে সম্পর্কের সমাপ্তি নয়। তার মৃত ভাইবোন এখনও তার জীবনের অংশ, সে তাদের কবরের কাছে যায়, তাদের সঙ্গে সময় কাটায়। তার কাছে শারীরিক অনুপস্থিতি সম্পর্কের অনুপস্থিতি নয়।
ওয়ার্ডসওয়ার্থ এখানে কোনো জটিল ভাষা ব্যবহার করেননি, কোনো খণ্ডিত চিত্রকল্পও তৈরি করেননি। অথচ, কবিতাটির গভীরতা অনবদ্য। এখানে, জটিলতা কবিতার ভাষার মধ্যে নয়; বরং, জটিলতা কবিতাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা অনুভূতির মধ্যে। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার একটি বড় শক্তি এখানেই। তিনি পরিচিত বাস্তবতার ভেতরে এমন একটি মানবিক সত্য আবিষ্কার করেন, যা পাঠককে নিজের অভিজ্ঞতার দিকে ফিরিয়ে নেয়, কোনো কল্পিত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তাকে সুখানুভুতি পেতে হয় না।
এই পদ্ধতি উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু প্রবণতার সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। উত্তর-আধুনিক কবিতায় প্রায়সই বাস্তবতার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। একটি দৃশ্যের সঙ্গে আরেকটি দৃশ্যের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয় না, অর্থ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির থাকে না। পাঠককে নিজেই বিভিন্ন চিত্র ও শব্দের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে নিতে হয়। বাংলা কবিতায় রণজিৎ দাশের কবিতায় এই প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায়।
রণজিৎ দাশ তাঁর ‘মদ’ কবিতায় লিখেছেন,
“নারীর ভিতরে ডুবে পুরুষটির মৃত্যু হয়েছিল।”
এখানে মৃত্যু একটি সরল বাস্তব ঘটনা হিসেবে আসে না। ‘নারীর ভিতরে ডুবে’ যাওয়ার মধ্যে প্রেম, শরীর, আত্মবিলোপ কিংবা অস্তিত্বের সংকটের মতো একাধিক সম্ভাবনা তৈরি হয়। পাঠককে একটি নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়া হয় না। তাকে অর্থ তৈরি করতে হয়।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে। কবিতার কল্পনা যদি বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিচিত সম্পর্কগুলোকেই ভেঙে দেয়, তাহলে সেই কল্পনার আবেগ কোথা থেকে আসে? কবিতাটি কি কোনো অনুভূতিকে গভীর করছে, নাকি একটি অপ্রত্যাশিত চিত্রকল্পের বিস্ময় তৈরি করছে?
তবে রণজিৎ দাশের কবিতাকে সরাসরি অর্থহীন বলা এই আলোচনাকে দুর্বল করবে। তাঁর কবিতার খণ্ডিত চিত্রকল্পের ভেতরেও অর্থ রয়েছে। তিনি যে কাজটি করেন তা হচ্ছে, পাঠককে প্রচলিত অর্থ গ্রহণের সহজ পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া, পাঠককে সক্রিয় করা। এই কৌশলের নিজস্ব সাহিত্যিক মূল্য আছে। কিন্তু ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। পাঠককে সক্রিয় করার পাশাপাশি কবিতা কি তাকে কোনো মানবিক অনুভূতির কাছেও নিয়ে যাচ্ছে? নাকি, পাঠককে শুধু ভাষার সংকেত ও চিত্রকল্পের সম্পর্ক নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে?
ওয়ার্ডসওয়ার্থের I Wandered Lonely as a Cloud কবিতায় প্রকৃতি ও স্মৃতির সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট। কবি ড্যাফোডিল ফুলের মুখোমুখি হন, সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারেন না, এই দৃশ্য তাঁর ভেতরে কিসের বীজ রোপন করে রেখে যাচ্ছে। পরে একাকী অবস্থায় সেই দৃশ্য স্মৃতিতে ফিরে আসে:
“They flash upon that inward eye”
অর্থাৎ, প্রকৃতির সেইসব বাহ্যিক দৃশ্য পরে কবির অন্তর্জগতের স্মৃতিতে ফিরে আসে। ড্যাফোডিল শুধু ফুলের দৃশ্য হিসেবে নয়, বরং তা একাকিত্বের মধ্যে আনন্দের উৎস হয়ে ফিরে আসে।
এখানেই ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘emotion recollected in tranquility’ ধারণার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। অভিজ্ঞতা প্রথমে বাইরে ঘটে, পরে তা স্মৃতিতে ফিরে আসে। স্মৃতি তাকে নতুন অর্থ দেয়, তারপর কবিতা সেই অভিজ্ঞতাকে রূপ দেয়।
উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু রচনায় এই ধারাবাহিকতা অন্যভাবে কাজ করে। সেখানে দৃশ্যটি প্রায় সময় স্মৃতির একটি সুসংহত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয় না; বরং, একাধিক বিচ্ছিন্ন চিত্র পাশাপাশি থাকে, পাঠককে তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। এখানে চিত্রকল্প অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট দৃশ্যের বদলে একাধিক সম্ভাব্য অর্থের দরজা খুলে দেয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ হয়তো বলতেন, কবিতার চিত্রকল্পের কাজ শুধু রহস্য তৈরি করা নয়। সেই চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে কোনো অনুভূতিকে স্থায়ী করে তোলাও তার কাজ।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের Lines Written in Early Spring কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক মাত্রা পায়। তিনি লিখছেন,
“To her fair works did Nature link
The human soul that through me ran”
প্রকৃতি এখানে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং, প্রকৃতি মানুষের আত্মার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যেই কবির মনে মানুষের সমাজের প্রতি বেদনা জেগে ওঠে। তিনি বলেন,
“And much it grieved my heart to think
What man has made of man.”
প্রকৃতির মধ্যে বসে কবি মানুষের দিকে ফিরে তাকান। পাখি, ফুল, গাছপালা তাকে আনন্দিত করে, কিন্তু মানুষের তৈরি সমাজ তাকে ব্যাথিত করে।
এখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রকৃতি তাঁর কাছে পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নয়। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে তিনি আবার মানুষের কাছেই ফিরে আসেন। তাঁর প্রকৃতি মানুষের সামাজিক ও নৈতিক অবস্থাকে প্রশ্ন করার জায়গাও।
এই ধারাবাহিকতায় উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি প্রশ্ন তোলা যায়। ভাষা যদি নিজের ভেতরেই ঘুরতে থাকে, তাহলে তা কি মানুষের সামাজিক বাস্তবতার কাছে ফিরে আসতে পারে? কবিতার ভাঙন কি শুধু ভাষার ভাঙন, নাকি সেই ভাঙনের সঙ্গে মানুষের জীবনের কোনো সম্পর্কও আছে?
ওয়ার্ডসওয়ার্থের Three Years She Grew কবিতায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর। Lucy নামের শিশুটিকে প্রকৃতি নিজের কাছে নিয়ে নেয়। প্রকৃতি সেখানে শুধু বাইরের পরিবেশ নয়; প্রকৃতি হয়ে ওঠে শিক্ষিকা, অভিভাবক এবং নৈতিক শক্তি। শিশুটির ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে পাহাড়, মেঘ, নদী, বাতাস ও নীরবতার সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। পরে Lucy মারা গেলে সেই প্রকৃতিই কবির স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে প্রকৃতি এবং মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। প্রকৃতি মানুষের চরিত্র নির্মাণ করে, মানুষ প্রকৃতিকে তার স্মৃতি ও অনুভূতির মাধ্যমে নতুন অর্থ দেয়। উত্তর-আধুনিক কবিতায় প্রকৃতি কখনো চিত্রকল্পের উপাদান, কখনো ভাষার সংকেত, কখনো সাংস্কৃতিক নির্মাণ হিসেবে হাজির হতে পারে। ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে প্রশ্ন হতে পারে, প্রকৃতিকে আমরা শুধু একটি সংকেত হিসেবে দেখব, নাকি তার সঙ্গে মানুষের জীবন্ত সম্পর্কটিকেও কবিতার কেন্দ্রে রাখব?
রণজিৎ দাশের ‘জঙ্গল-কবিতা’য় প্রকৃতিকে একটূ অন্যভাবে দেখা যায়। সেখানে,
“আমি জিপ থেকে নেমে, পায়ে হেঁটে, বৃক্ষের অক্ষর ছুঁয়ে ছুঁয়ে
এ-কবিতা পড়ি। দেখি, ঊর্ধ্ব-কমার মতো, সেগুন-মঞ্জরি
পাতার মর্মরশব্দে গাঁথা, যেন ছন্দের প্রহরী।”
এখানে বন আর শুধু বন নয়। বৃক্ষ হয়ে ওঠে অক্ষর। বন হয়ে ওঠে কবিতা। প্রকৃতি হয়ে ওঠে পাঠ্য। এই কৌশল ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকৃতিবোধের সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় তুলনা তৈরি করে।
দুজনের কাছেই প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ব্যবহারের পদ্ধতি আলাদা। ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতির মধ্যে মানুষের নৈতিক ও মানসিক বিকাশের শক্তি খুঁজে পান। রণজিৎ দাশ প্রকৃতিকে ভাষার রূপকে পরিণত করেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে প্রকৃতি মানুষকে বদলায়। রণজিৎ দাশের কবিতায় প্রকৃতি নিজেই একটি পাঠ্য হয়ে ওঠে।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে এখানেও প্রশ্ন করা যায়। প্রকৃতিকে কবিতায় রূপ দেওয়া সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন কবিতা প্রকৃতির নিজস্ব জীবন ও মানুষের অনুভূতি পেছনে সরে গিয়ে প্রকৃতি শুধু একটি নান্দনিক সংকেতে পরিণত হয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকৃতি প্রতীক হওয়ার আগে জীবন্ত অভিজ্ঞতা; রণজিৎ দাশের ক্ষেত্রে প্রকৃতি একই সঙ্গে দৃশ্য, চিত্রকল্প এবং ভাষার উপাদান। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের She Dwelt among the Untrodden Ways কবিতাতেও সাধারণ মানুষের জীবন কবিতার কেন্দ্রে উঠে আসে। Lucy পৃথিবীর কাছে প্রায় অচেনা একজন মানুষ। কবি বলেন,
“A Maid whom there were none to praise
And very few to love.”
তার সামাজিক গুরুত্ব প্রায় নেই। কিন্তু কবির কাছে তার মৃত্যু বিশাল ব্যক্তিগত ক্ষতি। শেষ স্তবকে তিনি বলেন,
“But She is in her grave,and, oh,
The difference to me!”
এই পঙক্তির শক্তি তার সরলতায়। Lucy পৃথিবীর কাছে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়, কিন্তু একজন মানুষের কাছে সে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ার্ডসওয়ার্থ সেই ব্যক্তিগত অনুভূতিকেই কবিতার বিষয় করেন।
এখানেও তাঁর কাব্যপদ্ধতির সঙ্গে উত্তর-আধুনিক কাব্যপ্রবণতার পার্থক্য দেখা যায়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ সাধারণত অর্থকে অস্পষ্ট করার জন্য ভাষাকে ভাঙেন না; বরং, সাধারণ মানুষের জীবনের ভেতরে এমন অনুভূতি খুঁজে বের করেন, যা আগে হয়তো সাধারণ বলেই অদৃশ্য ছিল। তাঁর কাব্যিক কৌশল পরিচিত বাস্তবতাকে অপরিচিত করার বদলে পরিচিত বাস্তবতার গভীরতাকে প্রকাশ করে।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের Tintern Abbey তাঁর সমগ্র কাব্যদর্শনের সবচেয়ে পরিণত উদাহরণগুলোর একটি। পাঁচ বছর পর কবি একই প্রকৃতির কাছে ফিরে আসেন। তিনি বলেন,
“Five years have past; five summers, with the length
Of five long winters! and again I hear
These waters, rolling from their mountain-springs
With a soft inland murmur.”
সময়ের হিসাব এখানে শুধু ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়। পাঁচ বছর মানে পাঁচ বছরের মানসিক পরিবর্তন। একই প্রকৃতি ফিরে এসেছে, কিন্তু কবি আগের মানুষটি নেই; তাই প্রকৃতিও তার কাছে আগের মতো নেই।
শৈশবে প্রকৃতি ছিল ইন্দ্রিয়ের আনন্দ, পরিণত বয়সে প্রকৃতি হয়ে ওঠে চিন্তার বিষয়। কবি আর শুধু পাহাড়, নদী ও গাছ দেখেন না। প্রকৃতির মধ্যে এমন একটি শক্তি অনুভব করেন, যা মানুষের মনকে শান্ত করে এবং নৈতিকভাবে প্রভাবিত করে।
এখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। তাঁর কবিতায় ভাঙনের বদলে রূপান্তর আছে। অভিজ্ঞতার বিলোপ হয় না, স্মৃতিতে ফিরে আসে। স্মৃতি চিন্তায় রূপ নেয়, চিন্তা রুপান্তরিত হয় কবিতায়। সময়, স্মৃতি এবং অনুভূতির মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা সবসময়ই থাকে।
অন্যদিকে উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু রচনায় এই ধারাবাহিকতা ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে দেওয়া হয়। রণজিৎ দাশের কবিতায় নিজের শরীরকে অন্যের শরীর মনে হওয়া, মৃত মানুষকে অপ্রত্যাশিত চিত্রকল্পে দেখা কিংবা প্রকৃতিকে ভাষার অক্ষরে রূপান্তরিত করার মতো কৌশল পাঠককে স্থির অর্থ থেকে সরিয়ে দেয়।
রণজিৎ দাশের ‘তাপমান’ কবিতার একটি পঙক্তি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ:
“নিজের শরীরে হাত দিয়ে যখন মনে হয় অন্যের শরীরে হাত দিয়েছি, তখন জল এবং পাহাড়িগান ভীষণ বিপজ্জনক। ”
এখানে নিজের শরীরই নিজের কাছে অপর হয়ে যায়। ‘আমি’ এবং ‘অন্য’ একই শরীরের মধ্যে এসে দাঁড়ায়। আত্মপরিচয়ের যে স্থির ধারণা, কবি সেটিকে অস্থির করে দেন। উত্তর-আধুনিকতার পরিচয়-সংকটের সঙ্গে এই কৌশলের সম্পর্ক এখানেই।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে কিন্তু ‘আমি’ এমনভাবে বিচ্ছিন্ন নয়। তাঁর ‘আমি’ স্মৃতির মধ্য দিয়ে নিজেকে চিনতে শেখে। প্রকৃতি তার আত্মপরিচয়কে গভীর করে। Tintern Abbey-এর কবি অতীতের নিজেকে বর্তমানের নিজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তাঁর পরিচয় বদলায়, কিন্তু সম্পূর্ণ ভেঙে যায় না। সেখানে একটি আত্মগত ধারাবাহিকতা থাকে।
রণজিৎ দাশের কবিতায় সেই ধারাবাহিকতাকে প্রশ্ন করা হয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় আত্মপরিচয়ের পরিবর্তন একটি বিকাশ। উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু রচনায় পরিচয়ের ভাঙন নিজেই একটি অভিজ্ঞতা। এই দুইয়ের পার্থক্য তাই শুধু কাব্যভাষার নয়। মানুষের ‘আমি’কে দেখার মধ্যেও পার্থক্য।
ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে জীবন সময়ের সঙ্গে বদলায়, স্মৃতি তাকে ধরে রাখে। মৃত্যু তাকে অন্য অর্থ দেয়। কিন্তু উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু প্রবণতায় জীবন নিজেই হয়ে উঠতে পারে একটি বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত, একটি সংকেত বা একটি অস্থায়ী চিত্রকল্প।
এখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের সঙ্গে রণজিৎ দাশের পার্থক্যকে খুব সরলভাবে ‘অর্থপূর্ণ’ বনাম ‘অর্থহীন’ বলা যাবে না। বরং দুজনের কবিতার অর্থ তৈরির পদ্ধতি আলাদা। ওয়ার্ডসওয়ার্থ পাঠককে অনুভূতির ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যান। রণজিৎ দাশ পাঠককে খণ্ডিত অভিজ্ঞতার মধ্যে অর্থ খুঁজতে দেন।
এ কারণেই উত্তর-আধুনিক কবিতার বিরুদ্ধে ওয়ার্ডসওয়ার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে তোলা আপত্তি সরাসরি দুর্বোধ্যতা নিয়ে নয়। আপত্তি হতে পারে কবিতার কেন্দ্র নিয়ে। কবিতার কেন্দ্রে মানুষ থাকবে, নাকি ভাষা থাকবে? অনুভূতি থাকবে, নাকি তার নির্মাণপ্রক্রিয়া থাকবে? জীবন থাকবে, নাকি জীবনের ভাষাগত প্রতিরূপই প্রধান হয়ে উঠবে?
এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। উত্তর-আধুনিক কবিতার সব রচনাকে একইভাবে বিচার করা যায় না। খণ্ডিত ভাষা সবসময় কৃত্রিম নয়, আধুনিক জীবনের খণ্ডিত অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে খণ্ডিত ভাষা প্রয়োজন হতে পারে। পরিচয়ের অনিশ্চয়তা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা হতে পারে, অর্থের বহুত্বও সাহিত্যের শক্তি হতে পারে। ফলে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যতত্ত্ব দিয়ে উত্তর-আধুনিক কবিতার সব রচনাকে বাতিল করা যাবে না।
বরং ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট। কবিতার নতুনত্ব কি শুধু ভাষা ও প্রকরণে থাকবে? নাকি সেই নতুনত্ব মানুষের অভিজ্ঞতাকেও নতুনভাবে দেখাবে? কবিতা যদি বাস্তবতার ধারাবাহিকতা ভাঙে, তবে সেই ভাঙনের মধ্য দিয়ে মানুষের কোন সত্যটি প্রকাশিত হচ্ছে? কবিতা যদি অর্থকে অনিশ্চিত করে, তবে সেই অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে মানুষের অনুভূতির কোনো নতুন সত্য আবিষ্কৃত হচ্ছে কি?
ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় উত্তরটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। We Are Seven পাঠককে মৃত্যু ও সম্পর্কের অন্য এক অনুভূতির সামনে দাঁড় করায়। Daffodils দেখায় কীভাবে একটি সাধারণ প্রকৃতিদৃশ্য স্মৃতির মধ্যে নতুন জীবন পায়। Lines Written in Early Spring প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে মানুষের সামাজিক নিষ্ঠুরতার দিকে নিয়ে যায়। Three Years She Grew প্রকৃতিকে মানুষের চরিত্র নির্মাণের শক্তি হিসেবে দেখায়। Lucy-র কবিতাগুলো দেখায়, পৃথিবীর কাছে অখ্যাত একজন মানুষও ব্যক্তিগত অনুভূতির জগতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আর Tintern Abbey দেখায়, একটি বাহ্যিক দৃশ্য কীভাবে সময়, স্মৃতি, চিন্তা ও আত্মবোধের মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণ মানবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
এই কারণেই ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার শক্তি শুধু সরল ভাষায় নয়। তাঁর শক্তি হলো সরল অভিজ্ঞতার ভেতরে জটিল মানবিক সত্য আবিষ্কার করা। উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু প্রবণতা যেখানে জটিল ভাষা ও খণ্ডিত চিত্রের মাধ্যমে অর্থকে অনিশ্চিত করে, ওয়ার্ডসওয়ার্থ সেখানে পরিচিত জীবন ও প্রকৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অর্থকে গভীর করেন।
তবে উত্তর-আধুনিক কবিতার সাহিত্যিক মূল্য এখানেই শেষ হয়ে যায় না। তার খণ্ডন, ব্যঙ্গ, অনিশ্চয়তা এবং ভাষার ওপর জোর আধুনিক মানুষের অন্য এক অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করতে পারে। প্রচলিত অর্থের প্রতি সন্দেহও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক অবস্থান। কিন্তু ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে সেই অবস্থানের কাছে একটি প্রশ্ন থাকবে। কবিতা যদি সব স্থির অর্থকে ভেঙে দেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত কোন মানবিক অভিজ্ঞতার কাছে সে পাঠককে নিয়ে যাবে?
ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে কবিতা শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই ফিরে আসে। তাঁর প্রকৃতি মানুষকে ভুলিয়ে দেয় না, বরং মানুষকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। তাঁর স্মৃতি অতীতকে শুধু সংরক্ষণ করে না, বরং বর্তমানকে নতুন করে বোঝায়। তাঁর সাধারণ মানুষ কেবল কবিতার চরিত্র নয়, বরং তারা মানুষের মৌলিক অনুভূতির বাহক।
অন্যদিকে উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু রচনায় কবিতা নিজেকেও প্রশ্ন করে। কবিতা কী? অর্থ কোথায়? বক্তা কে? বাস্তবতা কী? ভাষা কি সত্যিই কোনো স্থির অর্থ বহন করে? এসব প্রশ্ন সাহিত্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু ওয়ার্ডসওয়ার্থের চোখে এখানেই কবিতার আরেকটি পরীক্ষা শুরু হয়।
ভাষাকে ভাঙলেন, অর্থকে প্রশ্ন করলেন, পরিচয়কে সন্দেহ করলেন, বাস্তবতাকে খণ্ডিত করলেন। কিন্তু সেই ভাঙা ভাষার ভেতর দিয়ে মানুষকে তার নিজের জীবনের কাছে ফিরিয়ে আনলেন কোথায়?
কবিতা কি শুধু নিজের ভাষাকে আবিষ্কার করবে? নাকি ভাষার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনকেও নতুন করে আবিষ্কার করবে? ওয়ার্ডসওয়ার্থের উত্তর সম্ভবত দ্বিতীয়টিই। কারণ তাঁর কাছে কবিতার সবচেয়ে বড় বিষয় শেষ পর্যন্ত কবিতা নিজে নয়, মানুষ। ভাষা কবিতার শরীর, অনুভূতি তার প্রাণ, স্মৃতি তার গভীরতা, প্রকৃতি তার বিস্তার আর মানুষের জীবন তার উৎস।