article

article • September 23, 2026 ↗

Wordsworth-এর চোখে উত্তর-আধুনিক কবিতার সংকট


রোমান্টিক কবিতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ নাম উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ। তাঁর কাছে কবিতা শুধু ছন্দ, অলংকার কিংবা সুন্দর কিছু শব্দের পরপর বিন্যাস নয়। বরং তার মতে, কবিতার উৎস মানুষের জীবনের গভীরে; মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি, প্রকৃতি এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কবিতাকে জন্ম দেয়। তাঁর বিখ্যাত ধারণা, poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings, recollected in tranquility। অর্থাৎ, তীব্র অনুভূতি থেকেই কবিতার জন্ম এবং সেই অনুভূতি সরাসরি কবিতার রূপ লাভ করে না। বরং, স্মৃতি ও চিন্তার মধ্য দিয়ে তা পরিণত হয় কবিতায়।


এই ধারণায় ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে কবিতা ভাষার বিচ্ছিন্ন নির্মাণ নয়। কবিতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসে। একটি দৃশ্য কবিকে স্পর্শ করে, একটি মৃত্যু তাকে নাড়া দেয়, প্রকৃতির মুহূর্তগুলো তার মনে স্থায়ী হয়। পরে সেইসব অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে ফিরে আসে এবং চিন্তা ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে গিয়ে তা নতুন অর্থ পায়। কবিতা তখন শুধু ঘটনার বর্ণনা থাকে না। তা হয়ে ওঠে অনুভুতি ও অভিজ্ঞতার যৌগিক পুনর্গঠন।


এই অবস্থান থেকে উত্তর-আধুনিক কবিতাশৈলীর কিছু প্রবণতার সঙ্গে ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটি মৌলিক দূরত্ব তৈরি হয়। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়সই একক অর্থ, ধারাবাহিকতা, স্থির পরিচয় এবং প্রচলিত কাব্যভাষাকে প্রশ্ন করে। উত্তরাধুনিক কবিরা কবিতার ভাষাকে ভেঙেছেন, বাক্যের স্বাভাবিক বিন্যাস বদলেছেন, অনেকগুলো খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। কখনো কখনো কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে কবিতার নিজেরই ভাষা। এই প্রবণতাগুলোর সাহিত্যিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নিশ্চয় নেই। কিন্তু, ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে, কবিতা যদি নিজের নির্মাণ নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তার মাঝে মানুষের জীবনের জায়গাটি থাকে কোথায়?


ওয়ার্ডসওয়ার্থ সাধারণ মানুষের জীবন, সাধারণের ভাষাকেই কবিতার উপযুক্ত বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছেন, কবিতা কোনো অভিজাত জগতের বিষয় হবে না। বরং, সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ, শিশু, প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু, প্রেম এবং সাধারণ জীবনের  ঘটনাগুলোই হবে কবিতার উপাদান। তিনি শুধু মানুষের জীবনকে কবিতায় নিয়ে আসেননি, সেই জীবনের অনুভূতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর মতে, কবিতার ভাষা হবে সহজ, কিন্তু সেই সহজতার ভেতরেই থাকবে অনুভূতির গভীরতা। এককথায় যদি বলি সাধারণের ভাষায় সাধারণের কথা বলে সাধারণের মনে সুখানুভুতি জোগাবে কবিতা; অভিজাত্যের দুর্বোধ্য খোলসে আবদ্ধ হওয়া কবিতার লক্ষ্য নয়।


এই ধারণাটি স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তাঁর We Are Seven কবিতায়। একটি ছোট মেয়েকে কবি জিজ্ঞেস করেন, তার ভাইবোন কয়জন। মেয়েটি বলে, সাতজন। অথচ, তাদের দুজন মারা গেছে। কবি যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝাতে চান, মৃত দুজনকে বাদ দিলে তারা পাঁচজন। কিন্তু মেয়েটি বারবার বলে,


“O Master! we are seven.”


এখানে, Wordsworth যুক্তি ও অনুভূতির মধ্যে একটি গভীর পার্থক্য তৈরি করেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে হয়তোবা মৃত্যু মানে অনুপস্থিতি। কিন্তু, শিশুটির কাছে মৃত্যু মানে সম্পর্কের সমাপ্তি নয়। তার মৃত ভাইবোন এখনও তার জীবনের অংশ, সে তাদের কবরের কাছে যায়, তাদের সঙ্গে সময় কাটায়। তার কাছে শারীরিক অনুপস্থিতি সম্পর্কের অনুপস্থিতি নয়।


ওয়ার্ডসওয়ার্থ এখানে কোনো জটিল ভাষা ব্যবহার করেননি, কোনো খণ্ডিত চিত্রকল্পও তৈরি করেননি। অথচ, কবিতাটির গভীরতা অনবদ্য। এখানে, জটিলতা কবিতার ভাষার মধ্যে নয়; বরং, জটিলতা কবিতাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা অনুভূতির মধ্যে। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার একটি বড় শক্তি এখানেই। তিনি পরিচিত বাস্তবতার ভেতরে এমন একটি মানবিক সত্য আবিষ্কার করেন, যা পাঠককে নিজের অভিজ্ঞতার দিকে ফিরিয়ে নেয়, কোনো কল্পিত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তাকে সুখানুভুতি পেতে হয় না।


এই পদ্ধতি উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু প্রবণতার সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। উত্তর-আধুনিক কবিতায় প্রায়সই বাস্তবতার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। একটি দৃশ্যের সঙ্গে আরেকটি দৃশ্যের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয় না, অর্থ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির থাকে না। পাঠককে নিজেই বিভিন্ন চিত্র ও শব্দের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে নিতে হয়। বাংলা কবিতায় রণজিৎ দাশের কবিতায় এই প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায়।

রণজিৎ দাশ তাঁর ‘মদ’ কবিতায় লিখেছেন,


“নারীর ভিতরে ডুবে পুরুষটির মৃত্যু হয়েছিল।”


এখানে মৃত্যু একটি সরল বাস্তব ঘটনা হিসেবে আসে না। ‘নারীর ভিতরে ডুবে’ যাওয়ার মধ্যে প্রেম, শরীর, আত্মবিলোপ কিংবা অস্তিত্বের সংকটের মতো একাধিক সম্ভাবনা তৈরি হয়। পাঠককে একটি নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়া হয় না। তাকে অর্থ তৈরি করতে হয়।


ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে। কবিতার কল্পনা যদি বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিচিত সম্পর্কগুলোকেই ভেঙে দেয়, তাহলে সেই কল্পনার আবেগ কোথা থেকে আসে? কবিতাটি কি কোনো অনুভূতিকে গভীর করছে, নাকি একটি অপ্রত্যাশিত চিত্রকল্পের বিস্ময় তৈরি করছে?


তবে রণজিৎ দাশের কবিতাকে সরাসরি অর্থহীন বলা এই আলোচনাকে দুর্বল করবে। তাঁর কবিতার খণ্ডিত চিত্রকল্পের ভেতরেও অর্থ রয়েছে। তিনি যে কাজটি করেন তা হচ্ছে, পাঠককে প্রচলিত অর্থ গ্রহণের সহজ পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া, পাঠককে সক্রিয় করা। এই কৌশলের নিজস্ব সাহিত্যিক মূল্য আছে। কিন্তু ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। পাঠককে সক্রিয় করার পাশাপাশি কবিতা কি তাকে কোনো মানবিক অনুভূতির কাছেও নিয়ে যাচ্ছে? নাকি, পাঠককে শুধু ভাষার সংকেত ও চিত্রকল্পের সম্পর্ক নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে?


ওয়ার্ডসওয়ার্থের I Wandered Lonely as a Cloud কবিতায় প্রকৃতি ও স্মৃতির সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট। কবি ড্যাফোডিল ফুলের মুখোমুখি হন, সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারেন না, এই দৃশ্য তাঁর ভেতরে কিসের বীজ রোপন করে রেখে যাচ্ছে। পরে একাকী অবস্থায় সেই দৃশ্য স্মৃতিতে ফিরে আসে:


“They flash upon that inward eye”


অর্থাৎ, প্রকৃতির সেইসব বাহ্যিক দৃশ্য পরে কবির অন্তর্জগতের স্মৃতিতে ফিরে আসে। ড্যাফোডিল শুধু ফুলের দৃশ্য হিসেবে নয়, বরং তা একাকিত্বের মধ্যে আনন্দের উৎস হয়ে ফিরে আসে।

এখানেই ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘emotion recollected in tranquility’ ধারণার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। অভিজ্ঞতা প্রথমে বাইরে ঘটে, পরে তা স্মৃতিতে ফিরে আসে। স্মৃতি তাকে নতুন অর্থ দেয়, তারপর কবিতা সেই অভিজ্ঞতাকে রূপ দেয়।

উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু রচনায় এই ধারাবাহিকতা অন্যভাবে কাজ করে। সেখানে দৃশ্যটি প্রায় সময় স্মৃতির একটি সুসংহত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয় না; বরং, একাধিক বিচ্ছিন্ন চিত্র পাশাপাশি থাকে, পাঠককে তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। এখানে চিত্রকল্প অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট দৃশ্যের বদলে একাধিক সম্ভাব্য অর্থের দরজা খুলে দেয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ হয়তো বলতেন, কবিতার চিত্রকল্পের কাজ শুধু রহস্য তৈরি করা নয়। সেই চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে কোনো অনুভূতিকে স্থায়ী করে তোলাও তার কাজ।


ওয়ার্ডসওয়ার্থের Lines Written in Early Spring কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক মাত্রা পায়। তিনি লিখছেন,


“To her fair works did Nature link
The human soul that through me ran”


প্রকৃতি এখানে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং, প্রকৃতি মানুষের আত্মার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যেই কবির মনে মানুষের সমাজের প্রতি বেদনা জেগে ওঠে। তিনি বলেন,


“And much it grieved my heart to think

What man has made of man.”


প্রকৃতির মধ্যে বসে কবি মানুষের দিকে ফিরে তাকান। পাখি, ফুল, গাছপালা তাকে আনন্দিত করে, কিন্তু মানুষের তৈরি সমাজ তাকে ব্যাথিত করে।


এখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রকৃতি তাঁর কাছে পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নয়। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে তিনি আবার মানুষের কাছেই ফিরে আসেন। তাঁর প্রকৃতি মানুষের সামাজিক ও নৈতিক অবস্থাকে প্রশ্ন করার জায়গাও।


এই ধারাবাহিকতায় উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি প্রশ্ন তোলা যায়। ভাষা যদি নিজের ভেতরেই ঘুরতে থাকে, তাহলে তা কি মানুষের সামাজিক বাস্তবতার কাছে ফিরে আসতে পারে? কবিতার ভাঙন কি শুধু ভাষার ভাঙন, নাকি সেই ভাঙনের সঙ্গে মানুষের জীবনের কোনো সম্পর্কও আছে?


ওয়ার্ডসওয়ার্থের Three Years She Grew কবিতায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর। Lucy নামের শিশুটিকে প্রকৃতি নিজের কাছে নিয়ে নেয়। প্রকৃতি সেখানে শুধু বাইরের পরিবেশ নয়; প্রকৃতি হয়ে ওঠে শিক্ষিকা, অভিভাবক এবং নৈতিক শক্তি। শিশুটির ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে পাহাড়, মেঘ, নদী, বাতাস ও নীরবতার সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। পরে Lucy মারা গেলে সেই প্রকৃতিই কবির স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে।


ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে প্রকৃতি এবং মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। প্রকৃতি মানুষের চরিত্র নির্মাণ করে, মানুষ প্রকৃতিকে তার স্মৃতি ও অনুভূতির মাধ্যমে নতুন অর্থ দেয়। উত্তর-আধুনিক কবিতায় প্রকৃতি কখনো চিত্রকল্পের উপাদান, কখনো ভাষার সংকেত, কখনো সাংস্কৃতিক নির্মাণ হিসেবে হাজির হতে পারে। ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে প্রশ্ন হতে পারে, প্রকৃতিকে আমরা শুধু একটি সংকেত হিসেবে দেখব, নাকি তার সঙ্গে মানুষের জীবন্ত সম্পর্কটিকেও কবিতার কেন্দ্রে রাখব?


রণজিৎ দাশের ‘জঙ্গল-কবিতা’য় প্রকৃতিকে একটূ অন্যভাবে দেখা যায়। সেখানে,


“আমি জিপ থেকে নেমে, পায়ে হেঁটে, বৃক্ষের অক্ষর ছুঁয়ে ছুঁয়ে

এ-কবিতা পড়ি। দেখি, ঊর্ধ্ব-কমার মতো, সেগুন-মঞ্জরি 

পাতার মর্মরশব্দে গাঁথা, যেন ছন্দের প্রহরী।”


এখানে বন আর শুধু বন নয়। বৃক্ষ হয়ে ওঠে অক্ষর। বন হয়ে ওঠে কবিতা। প্রকৃতি হয়ে ওঠে পাঠ্য। এই কৌশল ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকৃতিবোধের সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় তুলনা তৈরি করে।


দুজনের কাছেই প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ব্যবহারের পদ্ধতি আলাদা। ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতির মধ্যে মানুষের নৈতিক ও মানসিক বিকাশের শক্তি খুঁজে পান। রণজিৎ দাশ প্রকৃতিকে ভাষার রূপকে পরিণত করেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে প্রকৃতি মানুষকে বদলায়। রণজিৎ দাশের কবিতায় প্রকৃতি নিজেই একটি পাঠ্য হয়ে ওঠে।


ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে এখানেও প্রশ্ন করা যায়। প্রকৃতিকে কবিতায় রূপ দেওয়া সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন কবিতা প্রকৃতির নিজস্ব জীবন ও মানুষের অনুভূতি পেছনে সরে গিয়ে প্রকৃতি শুধু একটি নান্দনিক সংকেতে পরিণত হয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকৃতি প্রতীক হওয়ার আগে জীবন্ত অভিজ্ঞতা; রণজিৎ দাশের ক্ষেত্রে প্রকৃতি একই সঙ্গে দৃশ্য, চিত্রকল্প এবং ভাষার উপাদান। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।


ওয়ার্ডসওয়ার্থের She Dwelt among the Untrodden Ways কবিতাতেও সাধারণ মানুষের জীবন কবিতার কেন্দ্রে উঠে আসে। Lucy পৃথিবীর কাছে প্রায় অচেনা একজন মানুষ। কবি বলেন,


“A Maid whom there were none to praise
And very few to love.”


তার সামাজিক গুরুত্ব প্রায় নেই। কিন্তু কবির কাছে তার মৃত্যু বিশাল ব্যক্তিগত ক্ষতি। শেষ স্তবকে তিনি বলেন,


“But She is in her grave,and, oh,

 The difference to me!”


এই পঙক্তির শক্তি তার সরলতায়। Lucy পৃথিবীর কাছে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়, কিন্তু একজন মানুষের কাছে সে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ার্ডসওয়ার্থ সেই ব্যক্তিগত অনুভূতিকেই কবিতার বিষয় করেন।


এখানেও তাঁর কাব্যপদ্ধতির সঙ্গে উত্তর-আধুনিক কাব্যপ্রবণতার পার্থক্য দেখা যায়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ সাধারণত অর্থকে অস্পষ্ট করার জন্য ভাষাকে ভাঙেন না; বরং, সাধারণ মানুষের জীবনের ভেতরে এমন অনুভূতি খুঁজে বের করেন, যা আগে হয়তো সাধারণ বলেই অদৃশ্য ছিল। তাঁর কাব্যিক কৌশল পরিচিত বাস্তবতাকে অপরিচিত করার বদলে পরিচিত বাস্তবতার গভীরতাকে প্রকাশ করে।


ওয়ার্ডসওয়ার্থের Tintern Abbey তাঁর সমগ্র কাব্যদর্শনের সবচেয়ে পরিণত উদাহরণগুলোর একটি। পাঁচ বছর পর কবি একই প্রকৃতির কাছে ফিরে আসেন। তিনি বলেন,


“Five years have past; five summers, with the length

Of five long winters! and again I hear

These waters, rolling from their mountain-springs

With a soft inland murmur.”



সময়ের হিসাব এখানে শুধু ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়। পাঁচ বছর মানে পাঁচ বছরের মানসিক পরিবর্তন। একই প্রকৃতি ফিরে এসেছে, কিন্তু কবি আগের মানুষটি নেই; তাই প্রকৃতিও তার কাছে আগের মতো নেই।

শৈশবে প্রকৃতি ছিল ইন্দ্রিয়ের আনন্দ, পরিণত বয়সে প্রকৃতি হয়ে ওঠে চিন্তার বিষয়। কবি আর শুধু পাহাড়, নদী ও গাছ দেখেন না। প্রকৃতির মধ্যে এমন একটি শক্তি অনুভব করেন, যা মানুষের মনকে শান্ত করে এবং নৈতিকভাবে প্রভাবিত করে।

এখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। তাঁর কবিতায় ভাঙনের বদলে রূপান্তর আছে। অভিজ্ঞতার বিলোপ হয় না, স্মৃতিতে ফিরে আসে। স্মৃতি চিন্তায় রূপ নেয়, চিন্তা রুপান্তরিত হয় কবিতায়। সময়, স্মৃতি এবং অনুভূতির মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা সবসময়ই থাকে।

অন্যদিকে উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু রচনায় এই ধারাবাহিকতা ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে দেওয়া হয়। রণজিৎ দাশের কবিতায় নিজের শরীরকে অন্যের শরীর মনে হওয়া, মৃত মানুষকে অপ্রত্যাশিত চিত্রকল্পে দেখা কিংবা প্রকৃতিকে ভাষার অক্ষরে রূপান্তরিত করার মতো কৌশল পাঠককে স্থির অর্থ থেকে সরিয়ে দেয়।

রণজিৎ দাশের ‘তাপমান’ কবিতার একটি পঙক্তি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ:


“নিজের শরীরে হাত দিয়ে যখন মনে হয় অন্যের শরীরে হাত দিয়েছি, তখন জল এবং পাহাড়িগান ভীষণ বিপজ্জনক। ”


এখানে নিজের শরীরই নিজের কাছে অপর হয়ে যায়। ‘আমি’ এবং ‘অন্য’ একই শরীরের মধ্যে এসে দাঁড়ায়। আত্মপরিচয়ের যে স্থির ধারণা, কবি সেটিকে অস্থির করে দেন। উত্তর-আধুনিকতার পরিচয়-সংকটের সঙ্গে এই কৌশলের সম্পর্ক এখানেই।


ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে কিন্তু ‘আমি’ এমনভাবে বিচ্ছিন্ন নয়। তাঁর ‘আমি’ স্মৃতির মধ্য দিয়ে নিজেকে চিনতে শেখে। প্রকৃতি তার আত্মপরিচয়কে গভীর করে। Tintern Abbey-এর কবি অতীতের নিজেকে বর্তমানের নিজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তাঁর পরিচয় বদলায়, কিন্তু সম্পূর্ণ ভেঙে যায় না। সেখানে একটি আত্মগত ধারাবাহিকতা থাকে।


রণজিৎ দাশের কবিতায় সেই ধারাবাহিকতাকে প্রশ্ন করা হয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় আত্মপরিচয়ের পরিবর্তন একটি বিকাশ। উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু রচনায় পরিচয়ের ভাঙন নিজেই একটি অভিজ্ঞতা। এই দুইয়ের পার্থক্য তাই শুধু কাব্যভাষার নয়। মানুষের ‘আমি’কে দেখার মধ্যেও পার্থক্য।


ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে জীবন সময়ের সঙ্গে বদলায়, স্মৃতি তাকে ধরে রাখে। মৃত্যু তাকে অন্য অর্থ দেয়। কিন্তু উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু প্রবণতায় জীবন নিজেই হয়ে উঠতে পারে একটি বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত, একটি সংকেত বা একটি অস্থায়ী চিত্রকল্প।


এখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের সঙ্গে রণজিৎ দাশের পার্থক্যকে খুব সরলভাবে ‘অর্থপূর্ণ’ বনাম ‘অর্থহীন’ বলা যাবে না। বরং দুজনের কবিতার অর্থ তৈরির পদ্ধতি আলাদা। ওয়ার্ডসওয়ার্থ পাঠককে অনুভূতির ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যান। রণজিৎ দাশ পাঠককে খণ্ডিত অভিজ্ঞতার মধ্যে অর্থ খুঁজতে দেন।


এ কারণেই উত্তর-আধুনিক কবিতার বিরুদ্ধে ওয়ার্ডসওয়ার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে তোলা আপত্তি সরাসরি দুর্বোধ্যতা নিয়ে নয়। আপত্তি হতে পারে কবিতার কেন্দ্র নিয়ে। কবিতার কেন্দ্রে মানুষ থাকবে, নাকি ভাষা থাকবে? অনুভূতি থাকবে, নাকি তার নির্মাণপ্রক্রিয়া থাকবে? জীবন থাকবে, নাকি জীবনের ভাষাগত প্রতিরূপই প্রধান হয়ে উঠবে?


এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। উত্তর-আধুনিক কবিতার সব রচনাকে একইভাবে বিচার করা যায় না। খণ্ডিত ভাষা সবসময় কৃত্রিম নয়, আধুনিক জীবনের খণ্ডিত অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে খণ্ডিত ভাষা প্রয়োজন হতে পারে। পরিচয়ের অনিশ্চয়তা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা হতে পারে, অর্থের বহুত্বও সাহিত্যের শক্তি হতে পারে। ফলে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যতত্ত্ব দিয়ে উত্তর-আধুনিক কবিতার সব রচনাকে বাতিল করা যাবে না।


বরং ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট। কবিতার নতুনত্ব কি শুধু ভাষা ও প্রকরণে থাকবে? নাকি সেই নতুনত্ব মানুষের অভিজ্ঞতাকেও নতুনভাবে দেখাবে? কবিতা যদি বাস্তবতার ধারাবাহিকতা ভাঙে, তবে সেই ভাঙনের মধ্য দিয়ে মানুষের কোন সত্যটি প্রকাশিত হচ্ছে? কবিতা যদি অর্থকে অনিশ্চিত করে, তবে সেই অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে মানুষের অনুভূতির কোনো নতুন সত্য আবিষ্কৃত হচ্ছে কি?


ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় উত্তরটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। We Are Seven পাঠককে মৃত্যু ও সম্পর্কের অন্য এক অনুভূতির সামনে দাঁড় করায়। Daffodils দেখায় কীভাবে একটি সাধারণ প্রকৃতিদৃশ্য স্মৃতির মধ্যে নতুন জীবন পায়। Lines Written in Early Spring প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে মানুষের সামাজিক নিষ্ঠুরতার দিকে নিয়ে যায়। Three Years She Grew প্রকৃতিকে মানুষের চরিত্র নির্মাণের শক্তি হিসেবে দেখায়। Lucy-র কবিতাগুলো দেখায়, পৃথিবীর কাছে অখ্যাত একজন মানুষও ব্যক্তিগত অনুভূতির জগতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আর Tintern Abbey দেখায়, একটি বাহ্যিক দৃশ্য কীভাবে সময়, স্মৃতি, চিন্তা ও আত্মবোধের মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণ মানবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।


এই কারণেই ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার শক্তি শুধু সরল ভাষায় নয়। তাঁর শক্তি হলো সরল অভিজ্ঞতার ভেতরে জটিল মানবিক সত্য আবিষ্কার করা। উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু প্রবণতা যেখানে জটিল ভাষা ও খণ্ডিত চিত্রের মাধ্যমে অর্থকে অনিশ্চিত করে, ওয়ার্ডসওয়ার্থ সেখানে পরিচিত জীবন ও প্রকৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অর্থকে গভীর করেন।


তবে উত্তর-আধুনিক কবিতার সাহিত্যিক মূল্য এখানেই শেষ হয়ে যায় না। তার খণ্ডন, ব্যঙ্গ, অনিশ্চয়তা এবং ভাষার ওপর জোর আধুনিক মানুষের অন্য এক অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করতে পারে। প্রচলিত অর্থের প্রতি সন্দেহও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক অবস্থান। কিন্তু ওয়ার্ডসওয়ার্থের অবস্থান থেকে সেই অবস্থানের কাছে একটি প্রশ্ন থাকবে। কবিতা যদি সব স্থির অর্থকে ভেঙে দেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত কোন মানবিক অভিজ্ঞতার কাছে সে পাঠককে নিয়ে যাবে?


ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে কবিতা শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই ফিরে আসে। তাঁর প্রকৃতি মানুষকে ভুলিয়ে দেয় না, বরং মানুষকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। তাঁর স্মৃতি অতীতকে শুধু সংরক্ষণ করে না, বরং বর্তমানকে নতুন করে বোঝায়। তাঁর সাধারণ মানুষ কেবল কবিতার চরিত্র নয়, বরং তারা মানুষের মৌলিক অনুভূতির বাহক।


অন্যদিকে উত্তর-আধুনিক কবিতার কিছু রচনায় কবিতা নিজেকেও প্রশ্ন করে। কবিতা কী? অর্থ কোথায়? বক্তা কে? বাস্তবতা কী? ভাষা কি সত্যিই কোনো স্থির অর্থ বহন করে? এসব প্রশ্ন সাহিত্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু ওয়ার্ডসওয়ার্থের চোখে এখানেই কবিতার আরেকটি পরীক্ষা শুরু হয়।


ভাষাকে ভাঙলেন, অর্থকে প্রশ্ন করলেন, পরিচয়কে সন্দেহ করলেন, বাস্তবতাকে খণ্ডিত করলেন। কিন্তু সেই ভাঙা ভাষার ভেতর দিয়ে মানুষকে তার নিজের জীবনের কাছে ফিরিয়ে আনলেন কোথায়?


কবিতা কি শুধু নিজের ভাষাকে আবিষ্কার করবে? নাকি ভাষার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনকেও নতুন করে আবিষ্কার করবে? ওয়ার্ডসওয়ার্থের উত্তর সম্ভবত দ্বিতীয়টিই। কারণ তাঁর কাছে কবিতার সবচেয়ে বড় বিষয় শেষ পর্যন্ত কবিতা নিজে নয়, মানুষ। ভাষা কবিতার শরীর, অনুভূতি তার প্রাণ, স্মৃতি তার গভীরতা, প্রকৃতি তার বিস্তার আর মানুষের জীবন তার উৎস।


article • September 18, 2026 ↗

৫ শতাংশ কোটা: পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব

২০১৮ সালের আগে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল ছিল। এর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে “বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ”-এর ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলো ছিল:

১. কোটা ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা।
২. কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা।
৩. একজন প্রার্থী যেন নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটা সুবিধা নিতে না পারেন।

এরপর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে এর বিস্তার ঘটে রাজধানীসহ সারাদেশে। ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা অবরুদ্ধ হয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করা হয়। এতে দেশের যোগাযোগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়।

আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। একই সময়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় বহু শিক্ষার্থী আহত হন। তবে দমন-পীড়নের পরও আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের সমর্থনে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।

আন্দোলনের তীব্রতা এবং দেশজুড়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণে এগিয়ে আসে। ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, “শিক্ষার্থীরা যখন কোটা চায় না, তখন কোনো কোটাই থাকবে না, সব কোটা বাতিল।”

তবে আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ছিল কোটা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা। এর পরিবর্তে সরকার কোটা সম্পূর্ণ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। জাতীয় সংসদে ঘোষণার পর ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করে। এর মাধ্যমে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে প্রচলিত ৫৬ শতাংশ কোটা বাতিল করে ১০০ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগের ব্যবস্থা চালু করা হয়।

২০১৮ সালে কোটা বাতিলের পর বিষয়টি আবারও আইনি ও রাজনৈতিক পরিসরে ফিরে আসে। ২০২১ সালে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের করা আপিলের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে হাইকোর্ট ২০১৮ সালের পরিপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে এই আন্দোলন একপর্যায়ে দেশব্যাপী ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

আন্দোলন ক্রমেই সংঘাতপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে সরকারি চাকরির কোটা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কোটা নিয়েও পরিবর্তন ও সংকোচন ঘটে। আপিল বিভাগের রায়ে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধাভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত হয়। আদিবাসীদের জন্য কোটা ১ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সমাবেশ থেকে আবারও উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে আদিবাসীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের দাবি ওঠে। এই দাবির যৌক্তিকতা তাই নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।

বিষয়টি শুধু কোটা কত শতাংশ হবে, তা নিয়ে নয়। এর সঙ্গে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বিদ্যমান বৈষম্যের প্রশ্নও জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের দুর্গম অঞ্চলের আদিবাসী শিক্ষার্থীরা এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়াশোনা করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সুযোগের ক্ষেত্রেও তাদের বাস্তবতা ভিন্ন। বিপরীতে ঢাকা ও অন্যান্য শহরের সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলে উভয় পক্ষের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে একই মানদণ্ডে বিচার করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের সব জাতিগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বিসিএসসহ সরকারি চাকরি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রধান ক্ষেত্র। সেখানে কোনো জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি দীর্ঘদিন সীমিত থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নীতি প্রণয়নে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলনও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ভূমি অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত সমস্যাগুলোর অনেকটাই অঞ্চলভিত্তিক। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে তাদের অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণ নীতিনির্ধারণকে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে পারে। একইভাবে উচ্চশিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়লে ভবিষ্যতে শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবী হিসেবে একটি বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বশীল শ্রেণি তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

তবে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়। এখানে সমান সুযোগ, ঐতিহাসিক বঞ্চনা এবং বর্তমান প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠী যদি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রাথমিক পর্যায়েই কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকে, তাহলে কেবল সবার জন্য একই প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়াই বাস্তবে সমান ফল নিশ্চিত করে না। এই জায়গা থেকেই বিশেষ ব্যবস্থা বা কোটা নীতির প্রয়োজনীয়তার যুক্তি তৈরি হয়।

অন্যদিকে, এমন নীতির ক্ষেত্রে কোটার হার, যোগ্যতার মানদণ্ড, সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্র এবং এর মেয়াদ নিয়েও সুস্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন। লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক পদ পূরণ করা নয়। বরং পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে তারা রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোয় আরও কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও এই আলোচনায় বিবেচনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় সামরিক উপস্থিতি ও সামরিক আগ্রাসন এবং সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীরা দেশের সাধারণ অর্থনৈতিক গতিশীলতা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এর প্রভাব শিক্ষা ও কর্মসংস্থান দুই ক্ষেত্রেই পড়েছে।

শিক্ষার ক্ষেত্রে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও শিক্ষা সহায়ক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য নিজ এলাকা ছেড়ে শহরে আসতে হয়। এতে তাদের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়। ফলে ঢাকা বা অন্যান্য শহরের তুলনামূলকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও প্রস্তুতির সুযোগ সবসময় সমান থাকে না।

এই বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষায় কেবল উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করলে পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আরও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ কোটা বা আসন সংরক্ষণ তাদের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবী হিসেবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পেতে পারে।

একই যুক্তি সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে শহরকেন্দ্রিক শিক্ষা, কোচিং, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রাপ্তির সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এসব সুবিধায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে। ফলে শুধু উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাকে নিয়োগের একমাত্র ভিত্তি করলে বিদ্যমান বৈষম্য পুরোপুরি বিবেচনায় আসে না।

সরকারি প্রশাসনে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্বের আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির মতো বিষয়ে তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রশাসনে তাদের অংশগ্রহণ থাকলে এসব বাস্তবতা নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে উঠে আসার সুযোগ তৈরি হয়। একইভাবে উচ্চশিক্ষায় প্রতিনিধিত্ব বাড়লে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দক্ষ ও প্রতিনিধিত্বশীল পেশাজীবী শ্রেণি গড়ে উঠতে পারে।

তবে কোটা কোনো স্থায়ী বিকল্প অবশ্যই নয়। এর পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা অবকাঠামো, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, শিক্ষক সংকট ও অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতি দূর করতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদে বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভর না করে সমান সুযোগে প্রতিযোগিতা করতে পারে। সেই পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে বিশেষ প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজন, তা নীতিগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

কোটা ব্যবস্থার পক্ষে সাংবিধানিক ভিত্তিও রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র নারী, শিশু কিংবা “নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য” বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে পারবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র চাইলে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। এই বিধানের আলোকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থাকার বাস্তবতা বিবেচনা করে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে।

তবে শুধু সাংবিধানিক সুযোগ থাকলেই কোনো নির্দিষ্ট কোটার কাঠামো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর বা ন্যায্য হয়ে যায় না। এর বাস্তব প্রয়োগ কতটা লক্ষ্যভিত্তিক, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আদিবাসী কোটার একটি বড় সমালোচনা এখানেই। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে এই সুবিধা তুলনামূলকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও শহরকেন্দ্রিক পরিবারের সন্তানরা বেশি পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি কিংবা সমতলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও সুযোগবঞ্চিত আদিবাসী শিক্ষার্থীরা কাঠামোগত কারণে সেই সুবিধা থেকে পিছিয়ে থাকে।

এই সমস্যা সমাধানে কোটার ভেতরেই আরও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন, নন-ক্রিমি লেয়ার নীতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবারকে কোটার সুবিধা থেকে বাদ দিয়ে তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ও সুযোগবঞ্চিত পরিবারের জন্য সুবিধা নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের আয়, অভিভাবকের পেশা, বসবাসের অঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধরন এবং প্রথম প্রজন্মের উচ্চশিক্ষার্থী কি না, এসব বিষয়ও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। এতে কোটা শুধু জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বাস্তব বঞ্চনার ভিত্তিতেও আরও লক্ষ্যভিত্তিক হতে পারে।

এখানে ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের মূল প্রশ্নটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল নিয়োগে মেধার প্রাধান্য নিশ্চিত করা। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধাভিত্তিক রাখার কাঠামো নির্ধারিত হয়। এই বাস্তবতায় আদিবাসীদের জন্য বিশেষ সুবিধার প্রশ্নটি মেধার বিপরীতে দাঁড় করানোর পরিবর্তে কীভাবে ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব ও প্রতিযোগিতার সুযোগের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা যায়, সেটিই মূল আলোচনার বিষয়।

আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত কোটার ওপর স্থায়ী নির্ভরতা তৈরি করা নয়। বরং যে বৈষম্য কোটার প্রয়োজন তৈরি করেছে, সেটিই ধীরে ধীরে দূর করা। পাহাড় ও সমতলের প্রান্তিক অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাড়ানো, দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা, আবাসিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সুবিধা সম্প্রসারণ করা এবং উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্গম অঞ্চলের কলেজ ও বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নও জরুরি।

যদি একজন পাহাড়ি শিক্ষার্থী এবং একজন শহুরে শিক্ষার্থী বাস্তবে একই মানের শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিক্ষক, তথ্য ও প্রস্তুতির সুযোগ পায়, তাহলে তাদের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রও অনেক বেশি সমতাভিত্তিক হবে। সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলে বিশেষ কোটার প্রয়োজনীয়তাও ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। তাই কোটা ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে না দেখে একটি সাময়িক ইতিবাচক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর পাশাপাশি এমন রাষ্ট্রীয় নীতি প্রয়োজন, যা ভবিষ্যতে কোটার প্রয়োজনীয়তাকেই কমিয়ে আনবে।

অর্থাৎ, বিতর্কটি শুধু ৫ শতাংশ কোটা থাকবে কি থাকবে না, এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন একটি জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুযোগের প্রয়োজন হচ্ছে, সেই বৈষম্য কোথায় তৈরি হচ্ছে এবং রাষ্ট্র কীভাবে তা দীর্ঘমেয়াদে দূর করবে। একই সঙ্গে কোটার সুবিধা যেন প্রকৃত সুযোগবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এই দুই দিক একসঙ্গে বিবেচনা করলেই কোটা নিয়ে বিতর্কটি আরও বাস্তবভিত্তিক ও নীতিনির্ভর আলোচনায় পরিণত হতে পারে।


article • September 18, 2026 ↗

টিকে থাকার রাজনীতি : ব্যক্তি স্বাধীনতা বনাম অস্তিত্ব

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের টিকে থাকার সংগ্রামকে আমলে না নিয়ে, জাতিগত পরিচয়কে ডিনায়ালে রেখে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়টিকে শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা লিবারেল মানসিকতার প্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ খুব একটা নেই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে দেখলে এর বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যটি আড়ালে থেকে যায়। কারণ বিষয়টি একদিকে, ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত পরিচয়কে নিজের মতো করে নির্ধারণ করার অধিকারের আলাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়টি যখন বৃহত্তর জনমিতিক ও ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে সংঘটিত হচ্ছে, তখন এটি কেবল ব্যক্তিজীবনেই প্রভাব ফেলছে না; বরং, সম্পূর্ণ জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, পরিচয় এবং অস্তিত্বের ওপরও প্রভাব ফেলছে।

বিশেষত এমন একটি বাস্তবতায়, যেখানে আমাদের দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও বিপুল জনসংখ্যার একটি জাতিগোষ্ঠীর পাশে ক্ষুদ্র জনসংখ্যার আদিবাসী জাতিসমূহ নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো ও স্বতন্ত্র পরিচয় বিলুপ্তির চরম হুমকিতে রয়েছে। সেখানে আন্তঃজাতিগত বিবাহের প্রশ্নটি ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি জনমিতি, ক্ষমতার অসমতা এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বিলুপ্তির প্রশ্নও করে।

এখানে পুরো বিষয়টিকে একটি অসম ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে রেখে দেখতে হবে। যখন দুটি জাতির মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে না, তখন ব্যক্তিস্বাধীনতার দোহাই মূলত শোষকের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এখানে একপক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্র, সংখ্যাগুরু জনসংখ্যা ও সামাজিক আধিপত্য; অন্যদিকে ক্ষুদ্র জনমিতি ও অস্তিত্বের সংকট। এই কাঠামোগত অসমতায় ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ বা ‘প্রেম’ এর বয়ানের মধ্য দিয়ে মূলত ঐতিহাসিক নিপীড়ন ও কাঠামোগত শোষণকে আড়াল করা হয়।

একই ঘটনাকে তাই দুটি ভিন্ন লেন্স এ ফেলে দেখতে হচ্ছে। ব্যক্তি স্তরে এটি স্রেফ স্বাধীনতার চর্চা; কিন্তু সমষ্টিগত বা সামগ্রিক বাস্তবতায় এটি সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ধ্বংসের কথাও বলে, জাতিগত অস্তিত্বের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথাও বলে। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বলে, এথনিক ক্লিনজিং তথা জাতিগত নিধনের অন্যতম একটি সুক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদী হাতিয়ারই হচ্ছে আন্তঃজাতিগত বিবাহ ও জোড়পূর্বক সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে তাই কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় কনজারভেটিজম বা আত্মরক্ষামূলক সংরক্ষণবাদ চর্চার।

এটি কেবল সামাজিক মেলামেশার বিষয় নয়, এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় পলিসি ও 'বাঙালিকরণের রাজনৈতিক ইতিহাস। স্বাধীন বাংলাদেশে সংবিধানের মাধ্যমে শুরুতেই জাতিগত সংখ্যালঘুদের পরিচয়কে অস্বীকার করে ‘বাঙালি’ পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জনসংখ্যাগত বিন্যাস বদলে দেওয়ার যে নীতি দেখা গেছে, তা রাষ্ট্রযন্ত্রের বাঙালিকরণ প্রকল্পেরই অংশ। এই রাষ্ট্রীয় পলিসির সমান্তরালে যখন সামাজিক স্তরে আন্তঃজাতিগত বিবাহ ঘটে, তখন তা অবচেতনে সেই রাষ্ট্রীয় আত্তীকরণ প্রকল্পকে ত্বরান্বিত করে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্যমতে, বাংলাদেশে জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ১.৬৫ শতাংশ। এই ১.৬৫ শতাংশ মানুষই হলো সেইসব সংখ্যালঘু জাতির সদস্য, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর তুলনায় সংখ্যার দিক থেকে খুবই ক্ষুদ্র এবং নিজেদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে।

এই ১.৬৫ শতাংশ মানুষকে যদি জাতিগতভাবে আলাদা করে দেখি, যেমন চাকমা, মারমা, গারো, ত্রিপুরা, লুসাই ইত্যাদি, তাহলে প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যার পার্সেন্টেজ আরও ছোট হয়ে আসে। যেমন ধরুন, লুসাইদের জনসংখ্যা ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাত্র ৩৮০ জন। এখন যদি লুসাইরা ব্যাপক হারে বাঙালিদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়ের চর্চা কমে আসে, তাহলে কয়েক প্রজন্ম পর বাংলাদেশে স্বতন্ত্র লুসাই পরিচয়ে মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু জনসংখ্যার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে একটি জাতিসত্তার দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক উপস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রশ্নও জড়িত।

এখানে বিষয়টি ব্যক্তির বাঙালির সঙ্গে বিবাহ করার অধিকার আছে কি নেই, সেই প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্নটা হচ্ছে, কয়েকশ মানুষের একটি জাতিগোষ্ঠী যখন প্রায় ১৭ কোটি মানুষের একটি দেশে বসবাস করে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাঙালি, তখন ব্যাপক আন্তঃজাতিগত বিবাহের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সেই ছোট জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের ওপর কী হতে পারে। এই প্রশ্নটি তাই শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গা থেকে নয়, বৃহত্তর জনমিতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার দিক থেকেই আলোচনার দাবি রাখে।

কারণ একটি জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব শুধু সেই জাতির কতজন মানুষ আছে, তার ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং নিজেদের জাতিগত পরিচয়ের ধারাবাহিকতাও জড়িত।

তাছাড়া, এখানে লাইফস্টাইলের ভিন্নতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালিদের সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, খাবার, স্বাধীনতার চর্চা এবং মানসিকতার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। বাল্যকাল থেকে তুলনামূলকভাবে স্বাধীন পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা একজন আদিবাসী নারী যখন কোনো বাঙালি পরিবারে বধু হয়ে যায়, তখন সে নিজেকে হঠাৎ করেই একটি বদ্ধ ও সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক পরিবেশে আবিষ্কার করবে।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো ফেটিসাইজেশন। মূলধারার বাঙালি সমাজে আদিবাসী নারীদের প্রায়শই এক ধরনের বহিরাগত, মেলোড্রামাটিক বা যৌনাকাঙ্ক্ষার বস্তু হিসেবে দেখা হয়। পাহাড়ি কলা, পাহাড়ি মধু, পাহাড়ি আলু, পাহাড়ি বেগুন বা পাহাড়ি মুরগির মতো ‘পাহাড়ি নারী’কেও একপ্রকার অবজেক্টিফাই করা হয়। সামাজিক মিডিয়া ও পপ-কালচারে এই ফেটিসাইজেশন এমন এক আবহ তৈরি করে, যা দিনশেষে আদিবাসী নারীর মানবিক মর্যাদা ও স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে অস্বীকার করে কেবল ভোগের বস্তুতে পরিণত করে।

তাছাড়া বাঙালিদের মধ্যে থাকা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববোধের কারণে অন্য জাতি থেকে আসা একজন মানুষকে প্রায়সই ছোট করে দেখার প্রবণতাও রয়েছে। এর ফলাফল হয় মানসিক নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন কিংবা পারিবারিক নিপীড়ন। বিবাহের আগে যতই লিবারেলিজম বা ফ্রিডমের আলাপ দেওয়া হোক না কেন, কিছু সময় পর দেখা যায় মেয়েটিকেই তার ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি এমনকি জাতিগত পরিচয় ত্যাগ করে বাঙালিত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। তখন লিবারেলিজমের কথা বলা সেই বাঙালি মানুষটিই তার শ্রেষ্ঠত্ববোধ থেকে বলতে থাকে, “মানিয়ে নাও, শুধু মানিয়ে নাও।” আর যদি মানিয়ে নিতে অপারগ হয়, তাহলে কোনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কপালে জোটে মানসিক ও শারীরিক আঘাত, এমনকি হত্যার মত চরম সহিংসতাও।

অন্যদিকে, একজন বাঙালি মেয়ে যখন আদিবাসী সমাজে বধু হয়ে আসে, তখন তার জন্যও নতুন সমাজের সংস্কৃতি ধারণ করা সহজ নয়। ধরা যাক, কোনো বাঙালি নারী একজন চাকমা পুরুষকে বিয়ে করলো। সে কি পাহাড়ে এসে এই পাহাড়ের সামগ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে? সে কি তার সন্তানকে শেখাতে পারবে কীভাবে ফুল বিজুতে ফুল অর্পণ করতে হয়, কীভাবে একটি পিনোন বা একটি খাদি বুনতে হয়? নাকি তার সন্তানকে শোনাতে পারবে ‘কবি-ধবি’র গল্প? বলতে পারবে ‘সুদোত্তুবি আর ভান্য বিলেই’-এর রূপকথা? কিংবা ‘বনবিলেজ’-এর রূপকথা শোনাতে শোনাতে গেয়ে শোনাতে পারবে,

“তুরু - তুরু বাল্ল্যে

পানি খেলে ছড়াত যা

ধান খেলে মুড়োত যা

আমা ধানুন তিদে

পর ধানুন মিদে

সিদু যা - সিদু যা।”

একজন আদিবাসী নারী যে মূল্যবোধ, ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে, সে তার সন্তানকে সেইভাবেই গড়ে তুলতে পারে। শত শত বছরের যে ট্র্যাডিশন আদিবাসী সমাজ প্রজন্মের পর প্রজন্ম উত্তরাধিকার হিসেবে বহন করে এসেছে, বাইরে থেকে এসে অন্য একজন নারী নিশ্চয়ই সেই সংস্কৃতির সবকিছু একইভাবে শিখতে, শেখাতে এবং প্রয়োগ করতে পারবে না। এখানে বিষয়টি কারও সক্ষমতা বা অক্ষমতার প্রশ্ন নয়; বরং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং সামাজিকীকরণের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রশ্ন।

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী বা অ্যাবোরিজিনালরা আন্তঃজাতিগত বিবাহ ও রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী নীতির মাধ্যমে  কীভাবে একটি আস্ত জনগোষ্ঠীকে সাংস্কৃতিক ও জনমিতিকভাবে বিলুপ্ত করা যায়, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।১৯৩০-এর দশকে অস্ট্রেলীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জৈবিক আত্তীকরণ নীতি গ্রহণ করে। সেই সময়কার চিফ প্রোটেক্টর অব অ্যাবোরিজিনস এ. ও. নেভিল খোলাখুলিভাবেই বলেছিলেন, সাদা চামড়ার ইউরোপীয়দের সাথে মিশ্র-বর্ণের আদিবাসীদের বিবাহে উৎসাহিত করে কয়েক প্রজন্মের মধ্যে আদিবাসী রক্তকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার (Breed out the color) করে ফেলা হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র সরাসরি আন্তঃজাতিগত বিবাহকে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে নিঃশব্দে বিলুপ্ত করার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তখনকার রাষ্ট্র ও সুশীল সমাজ এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে উন্নয়ন, সভ্যকরণ এবং আদিবাসীদের মূলধারায় মেশানোর একটি লিবারেল প্রজেক্ট হিসেবে প্রচার করেছিল। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একটি পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক ও জনমিতিক গণহত্যা।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, এক ক্ষুদ্র জাতির সঙ্গে অন্য ক্ষুদ্র জাতির (যেমন: চাকমার সঙ্গে মারমা, কিংবা পাংখুয়ার সঙ্গে লুসাই) বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়টিকে কিন্তু মূলধারার বাঙালি-আদিবাসী বিবাহের সমান্তরালে ফেলে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো Unequal Power Structure বা ক্ষমতার অসমতা কাজ করে না। এখানে কোনো পক্ষই আধিপত্যশীল শোষক জাতি হিসেবে উপস্থিত থাকে না। এই ধরনের আন্তঃজাতিগত বিবাহ মূলত মূলধারার 'বাঙালিকরণ' বা হেজিমোনিক আত্তীকরণের বিপরীতে গিয়েই দাঁড়ায়; অর্থাৎ, ক্ষুদ্র জাতিগুলোর মধ্যে একটি বহুত্ববাদী সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি গড়ে তোলে।

আমি মনে করি, এই মেলবন্ধনকে আমাদের ডেমোগ্রাফিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের জায়গা থেকে ইতিবাচকভাবেই দেখা উচিত। কারণ জীবনযাত্রার মৌলিক ভিত্তি, প্রকৃতি-নির্ভরশীলতা, উৎসবের ধরন কিংবা সামাজিকভাবে গড়ে ওঠার স্বাধীন পরিবেশের দিক থেকে আমাদের জাতিগুলোর মধ্যে এক ধরনের গভীর ঐতিহাসিক মেলবন্ধন রয়েছে। ফলে এখানে কাউকে তার মৌলিক আদিবাসী পরিচয়, ভাষা বা আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে মানিয়ে নেওয়ার নিপীড়নের ভেতর দিয়ে যেতে হয় না। তাই এক ক্ষুদ্র জাতির সঙ্গে অন্য ক্ষুদ্র জাতির বিবাহ কোনো অস্তিত্ব ধ্বংসকারী আত্তীকরণ নয়। বরং, এটি একই অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়ে নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্যকে ধারণ করে যৌথ সহাবস্থান এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটি রাজনৈতিক প্রতিরোধ হিসেবে দেখা উচিত।

বাঙালির সাথে সংখ্যালঘু জাতিসমূহের আন্তঃজাতিগত বিবাহের ক্ষেত্রে মূলত দুটি জিনিস মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে, ব্যক্তি স্বাধীনতা বনাম টিকে থাকা। ব্যক্তির নিজের জীবন, নিজের সম্পর্ক এবং নিজের পছন্দের ওপর স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। কিন্তু একটি তুলনামূলক সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি প্রজন্মের পর প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা এবং জনমিতিক উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত; তখন বিষয়টি শুধু ব্যক্তির স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এখানে সমান্তরালভাবে উঠে আসে লিবারেল প্রোগ্রেসিভদের দ্বিচারিতা। শহুরে সুশীল সমাজ বা তথাকথিত লিবারেল-প্রোগ্রেসিভ অংশটি যখন আদিবাসী প্রশ্নে কথা বলে, তখন তারা কাঠামোগত নিপীড়ন, ভূমি দখল বা সামরিকীকরণের মতো শক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতাগুলোকে এড়িয়ে যার। তারা বিষয়টিকে কেবল “ভালবাসার কোনো সীমানা নেই” কিংবা “ব্যক্তিস্বাধীনতা”-র মতো রোমান্টিক ও বিমূর্ত ধারণার ফ্রেমে বন্দি করতে চায়। এই প্রোগ্রেসিভরা নিজেদের প্রগতিশীল প্রমাণ করতে গিয়ে ক্ষমতার অসমতা এবং আত্তীকরণের রাজনীতিকে আড়াল করে ফেলে। এটি তাদের এক ধরণের রাজনৈতিক চাতুর্য ও সামাজিক দ্বিচারিতা, যা দিনশেষে সংখ্যাগুরু সংস্কৃতির আধিপত্যবাদ বা Cultural Hegemony টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

আমি মনে করি, এখানে টিকে থাকাটাই মুখ্য। কারণ টিকে থাকাই প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম। প্রাণীর বিবর্তনও কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকার প্রয়োজনেই ঘটেছে। একটি জাতিসত্তার ক্ষেত্রেও তাই প্রশ্নটা শুধু কে কাকে বিয়ে করলো, সেটা নয়; বরং সেই জাতিসত্তা তার ভাষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে আগামী প্রজন্ম পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আর সেই জায়গা থেকেই ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি একটি জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রশ্নটি বিশদ আলোচনার দাবি রাখে।

মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা অবশ্যই একটি সম্মানের বিষয়। একজন মানুষের নিজের জীবন ও নিজের সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে এবং সেই অর্থে ক্রস-ম্যারেজ করার স্বাধীনতার দাবিও অবশ্যই রয়েছে। ক্রস-ম্যারেজ করার ক্ষেত্রে বাধা থাকা উচিত নয়, কিন্তু সেটি কখন? যখন একটি জাতিসত্তা অন্য একটি জাতিসত্তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না; যখন একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে স্রেফ মানুষ হিসেবে চিনতে পারবে; যখন দুই জাতির মধ্যে জনসংখ্যার পার্থক্য এতটা প্রকট হবে না; যখন পাহাড়ি নারীদের ফেটিসাইজ ও অবজেক্টিফাই করা হবে না। মানুষ যখন মানুষকে স্রেফ মানুষ হিসেবে ভালোবাসবে, তখনই হয়তো এই স্বাধীনতার জায়গাটি তার সবচেয়ে স্বাভাবিক অর্থে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

কিন্তু সেটা কি আদৌ সম্ভব? বিশেষত একটি জাতাভিমানী জাতি, বাঙালির পাশে দাঁড়িয়ে? যেখানে তারা নিজেদের নারীদেরই অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারে না, সেখানে গিয়ে একজন আদিবাসী নারীর নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা নিয়ে টিকে থাকার গল্প কিছুটা হাস্যকর, আবার কিছুটা অবিশ্বাস্যও মনে হয়।

এদেশে ইনডিভিজুয়াল ফ্রিডম, ফ্রিডম অব স্পিচ, ফ্রিডম অব রিলিজিয়ন– এমন বিশাল বিশাল তত্ত্বকথার ফুলঝুরি ফোটানো হয়। কিন্তু বাস্তব চর্চার জায়গায় এসে দেখা যায়, এই স্বাধীনতাগুলোর সীমা খুব দ্রুতই নির্ধারিত হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন বিষয়টি জাতিগত পরিচয়, সংস্কৃতি কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠের সামাজিক ক্ষমতার সঙ্গে সংঘর্ষে আসে। unequal power structure-এ দাঁড়িয়ে লিবারেলিজমের এই বয়ান মূলত শোষিতকে নিঃশব্দে আত্তীকৃত করার হাতিয়ার বৈ কিছু নয়।

আমরা যখন নিজেদের অস্তিত্ব সংকটের চরম একটি মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি, তখন আন্তঃজাতিগত বিবাহের বিষয়টিকে শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই স্তরে দাঁড়িয়ে, সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য সংরক্ষণবাদী নীতি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। কারণ একটি জাতিসত্তা যখন সংখ্যার দিক থেকে এতটাই ক্ষুদ্র হয়ে যায় যে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও জনমিতিক উপস্থিতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন সেই জাতিসত্তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা অত্যাবশ্যক।

আমার কাছে সংরক্ষণবাদ এখানে কোনো পশ্চাৎপদ চিন্তা নয়; বরং জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার একটি হাতিয়ার। আর সেই লেন্স থেকে এটি শুধু সংস্কৃতি রক্ষার প্রশ্ন নয়, বরং একটি জাতিসত্তার অস্তিত্ব বিলীন হওয়া ঠেকানোর প্রশ্ন। সেই অর্থে, এথনিক ক্লিনজিংয়ের মতো চরম পরিণতি ঠেকানোর আলোচনাতেও এই বিষয়টির রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেননা, যতক্ষণ না ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য রক্ষা ও টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিরোধ।

article • September 17, 2026 ↗

Evolution : কি? কেনে অয়?

 

Evolution(বিবর্তন) অলদে এক্কান Scientific theory, উজুচ্ছে Theory / তত্ত্ব নয়। General Theory থিয়্যেই থায়দে একজনর বা একদাগির অনুমান গরানা, বিশ্বেজ গরানা উগুরে; আহ্, Scientific Theory অলদে একখেরে প্রমান অইয়্যে অক্ কধা। যেধক্কন এক্কান Scientific claim বৈজ্ঞেনিক experimentation আর observation অ ভিদিরে্দি যেইন্যে প্রমাণ ন’অয় সেধক্কন সং সিয়্যেন এক্কান Hypothesis, Scientific theory নয়। সে জাগানত, evolution অলদে এক্কান প্রমাণ অইয়ে Scientific theory।


‘Evolution Theory’- ইয়ানর কাম কি? বিবর্তন তত্ত্বর আজল কাম অলদে Generationঅ যেরে Generation ধরিন্যেই পরানবলাগুনোর ক্যেইয়ে গরন্ আহ্ খাচ্চ্যেক বদলানা’নি ভাঙি ভাঙি দেঘানা। আর, উজু কথায় পিত্তিমিত পরানর আরগানিত্তুন ধরিন্যেই এযহ্ সং পরানবলাগুনো ভিদিরে যা কিজু বদল্লে সিয়ানই অলদে evolution। 


চার্লস ডারউইন-অর ভাজে Evolution অর আজল কধা অলদে Natural selectionঅত পরানবলাগুনোর বলবলা Species উন তিগিবাক, পেত্তোমরা Speciesউন বংশ লুগিবাক। ইক্ক্যে Species কি? উজু কধায় Species অলাক্কে সিগুন, যিগুনে তারা তারা ভিদিরে সেক্স গরিনেই ছ’ফুদেই পারন। Species ভাগ কেনে অন? Mutation অইন্যেই। 


     Mutation কেনে অয় এক্কা আন্দাজ লোই:

আমি অ’লে খবর পেই Living organism-আনি DNA লোই বানেয়ে। DNA-ত পরানবলার বেক বিজক থরে থরে সাজেয়ে থায়। খালিক ভাইরাস উন অলাক্কে RNA লোই বানেয়ে, সেনত্যেই তারারে আমি পরানবলা ন’কোয়। পিত্তিমিত যিদুক্কুন পরানবলা আগিই, বেক্কুনোর DNA স্ট্রাকচার এক ধক্কেন, প্যাটার্ন-আনি Normally এক্কুই। মুনিচ্ছোর, সাপ, কুরো, শুগোর, কুগুর, এরেয়েপুক বেক এক্ সুদোনাল।


তে, DNA ভিদিরে থায়দে চের’আন এসিড: adenine(A), guanine(G), cytosine(C), thymine(T)।  AT একজুর, CG আরেকজুর। এ এসিড আনি এগত্তর অয়নে বানায় Nucleotide। উজুচ্ছে কধায় DNA-র নানান বাবত্যে Amino Acid-আনি এগত্তর অইন্যেই প্রোটিন বানায়। 


DNA অত্ত্যে Double Helix (দিবে সুদোনাল’ পাক)। Double Helix-ওত Acid-আনি নিত্য উগুদো অয়। যেন, পত্থম হেলিক্স (First Helix)-অত যুনি adenine(A) থায় সালেন সেকেন্ড Helix-ওত thymine(T) থেব, আরহ পত্থমত cytosine(C) থেলে সেকেন্ড'অত guanine(G) থেব। এবাবত্যে–


পত্থম হেলিক্সঃ 5' A T C G C T A C G 3'

সেকেন্ড হেলিক্সঃ 3' T A G C G A T G C 5'

5' (Five Prime) আর  3' (Three Prime) অলদে DNA-র asymmetric(সং নয়) মাধা।


DNA-ত এধক্কে সুর গরি AT CG জুর জুর চললে চললে যুনি আবাদা গরি বদলি যেইন্যে, এক্কান Acid অদল বদল অয় (ধজ্জো, adenine-অ জাগাত বজিলো guanine,  ন'লে cytosine-অ  জাগাত বজিলো thymine), সালেন গদি যেয়ে ঘন্দচক্র। একখা অদলবদলত্তে অয় যেব Mutation। RNA-ত থাইমিন অ আযায় থায়দে ইউরাসিল(U). তারা AU জুর বদন। DNA ধক RNA Mutation যে যে একখুই।


     এধক্কেন গরিন্যে Mutation অদে অদে বানা যাদন নুঅ Variant, নুঅ Species। কোটি কোটি বজর ধরি চলের Evolution। যে Species যেদক বলবলা গরি Mutation অব বা সিয়েনত্তুন সুবিধে পেব, তে সেধক বেজ তিগিবার চান্স পেব, যিগুন Mutation অইন্যেই ও সেনত্তুন সুবিধে ন’পেব সিবে পিচ্ছে পরিবো, লুগি যেব। ব্যাকটেরিয়া আহ্ ভাইরাস উন আমা মুজুঙেই এযান্ন্যে গরি নুঅ নুঅ ভ্যারিয়েন্ট অদন। এক্কান Example টানি চেই।


   এককোঅ পুগোত্তুন তিন্নো ছ ওইয়োন। তিন্নো তিন বাবদর।

   এককোঅ আগুন ন’চিনে, আগুনোত উজে যায়।

   আরেক্কো বিষফল ন’চিনে, মুজুঙোত প’লে খায়।

   লাস্টে ইবে, আগুন চিনে, বিষফল চিনে; আগুন দে’লে ধায়, বিষফল ন’খায়।

   সিত্তুন কুবো তিগি থেব? 


উজুচ্ছে গরি ইয়েনই Natural selection, survival of the fittest. ইঙুরিনেই পরানবলা আহ্ ভাইরাস উন মিউটেশন অন্, পরিবেশ অ লগে যে ভ্যারিয়েন্ট-ও Adapt অয় সিবে তিগি থায়। 


ডাক্তজ্জ্যে দাগি এন্টিবায়োটিক খেবার ক’লে কনধে গোদা ফাইল্লো(full dose) খেবার; কিত্যেই বিলি? যকখে একজনে দি একবার খেয়নেই এন্টিবায়োটিক খানা বন গরে সেকখে কি অয়, যিগুন এক্কা মরাধরা সে ব্যাকটেরিয়া-উন মরন; আহ্ যিগুন এক্কা রদেবদে সিগুন সেকখেও বাজি থান আহ্ এন্টিবায়োটিক আন চিনি লন। সে ধগে ধগে লারে লারে তারা ক্যেইয়েন Mutation অইন্যেই সে এন্টিবায়োটিক-আনত্ত্যেই Resistance বানেই তুলে, আরহ্ বলবলা ভ্যারিয়েন্ট ওই উদোন, যিগুনো ক্যেইয়েত আর সে এন্টিবায়োটিক-আন কাম ন’গরে। মুজুঙে দিনোত সেনত্তেয় মুনিচ্ছোর অ’লে সেবা কাজ' ধক্কেন অসুঘেও মুরি যেবাক, খালিক খেবার এন্টিবায়োটিক ন’থেব!


পিত্তিমির গরাত একবাবত্যে পরান, ভাঙ'দে জরাদে ইদ্দুরোত, কিয়ে মাদিত কিয়ে পানিত কিয়ে আগাজত; নিত্য একদাগি লুগি যাদন ন’তিগি! আমি Homo sapiens, জ্ঞ্যেনি মুনিচ্ছোর, আমার দুমুর কদ্দুর?

 


article • September 17, 2026 ↗

স্যাপিয়েন্স : যুদো মুনিচ্ছোরুন ভচ্ যানা গদি?

  


২৫লাখ বজর আগলইত্ত্যে আফ্রিকার পুগেন্দি থেদাক Australopithecus নাঙর পুরোনি বর বান্দর জাত্ত্যে(Primal Ape) পরানবলা। সিগুনোত্তুন Evolve(বিবর্তন) অইন্যে পুরোনি মুনিচ্ছোর-উন(primitive man) পিত্তিমিত ভেদা দোন। খালিক সেকখে পুরোনি মুনিচ্ছোর-উন লাখ লাখ বাবত্যে পরানবলালোই একলগে এলাক, তারাত্তুন কনকিত্যেন্দি যুদো ন’এলাক।  ২০লাখ বজর আগলইত্ত্যে পুরোনি মুনিচ্ছোর'উনোর এককোঅ দল, পুগো আফ্রিকা ইরিন্যেই নানান কিত্যা লদ্ দিলাক। সিগুনে উত্তর আফ্রিকা, ইউরোপ আর এশিয়াত যে যিন্নি পায় এগযা সিদি গেলাক,সে জাগানিত যুদো যুদো Climate-অ গদিয়ে নানান বাবত্যে Species(প্রজাতি) ইযেপ্যে আরহ্ Evolve অ’লাগ।


Species-উনোর Evolution(বিবর্তন)-আন তা যেরে তে, তা যেরে তে গরি উজু সুরুঙ গরি অইয়্যে ধরি ল’লে এক্কান ভুল অয়, সিয়্যেন ভালকজনে গরন; যেন্-  Homo ergaster-এ জনম দিয়্যে Homo erectus; Erectus-অত্তুন জনম ল্যইয়োন Neanderthal; Neanderthal-অত্তুন আমি, মানে Homo sapiens-উন এচ্ছেই। এবাবত্যে উজুচ্ছে মডেল-এ ধল্লে, আমার এক্কান ভুল অনুমান এযে, ইয়্যেন ভিলিনেই- পিত্তিমিত এক অক্তত এককোঅ গরি মুনিচ্ছোর-অ Species এলাক। খালিক আজলান অত্তে, ২০লাখ বজর আগলইত্ত্যেত্তুন ধরিনেই ১০আজার বজর আগলইত্ত্যেও পিত্তিমিত একখান অক্তত একসমারে এককোঅ-তুন বেজ মুনিচ্ছোর-অ Species খুজ দি বেরেয়োন। ইক্ক্যে শিয়েল, কুগুর, বাঘ, ভালুক, শুগর-অর এককোঅ-তুন বেজ Spacies একসমারে আমি পিত্তিমিত দেঘির; তে মুনিচ্ছোর অর কিত্তেই নেই? বেক্কুন কিত্তেই Homo sapiens? 


এইচ্চেত্তুন ১লাখ বজর আগলইত্ত্যেও কম গরিনেই ৬’বু মুনিচ্ছোর-অ Species একসমারে পিত্তিমিত এলাক। এশিয়ার পুগে থেদাক মুনিচ্ছোর-অ এককোঅ Species- ‘Homo erectus’। Erectus অলদে পিত্তিমি বুগোত বেগত্তুন বেজ তিগি থেইয়ে Species; তারা ২০লাখ বজর-অ কাজাকাইচ্চ্যে পিত্তিমিত বেরেই যেইয়্যোন। এ রেকর্ড'আন অ’লে মুনিচ্ছোর-অর কন Species এ ভাঙি পাত্তাক নয়। আমি Homo Sapiens-উন মুজুঙে ১ আজার বজর তিগি ন’তিগি উদো নেই, ২০লাখ বজর-অ পদ আহ্দানা আমা সেদাম’অ বারাহ্!


‘Homo soloensis নাঙে এককোঅ Species, ইন্দোনেশিয়ার জাভা Island-অত tropical climate-অত তিগি থেইয়োন। ইন্দোনেশিয়ার আর এককোঅ চিগোন Island, Flores-অত পুরোনি মুনিচ্ছোর-অ এককোঅ দল যদবইত্ত্যে বাক্কন গরিনেই Evolve অইয়োন। সে দল-লোঅ যেকখে সিদু যেইয়োন সেক্কে সাগরান তলে এলহ্। Ice Age অর থুমেন্দি যেক্কে ইউরেশিয়া বরফ-আনি গলিনেই সাগরান বাজ্জে, সেকখে সে মুনিচ্ছোর-উন সে দাঙদাঙয়ে ভিদেবোত বানাহ্ যেইয়োন। বর মুনিচ্ছোর-উন যিগুনোর খানা-দানা বেজ লাগে, সিগুন মরি যান, তারা ধারানে চিগোন মুনিচ্ছোর-উন বাজি থান। Generation-অ যেরে Generation ধরিনে সে Process-অ ভিদিরেদি যাদে যাদে তারা অ’লাক বাক্কন মুনিচ্ছোর। এ মুনিচ্ছোর-উন, সায়েন্টিস্ট’লগে যিগুনোরে নাঙ থোই দোন Homo floresiensis, তারা আলাজে এক মিটার লাম্বা আহ্ ভরে ২৫কেজি-তুন বেজ ন’এলাক। বাক্কন অলেও পাত্থর লোই নানাক্কান জিনিস বানে পাত্তাক, অক্ত অক্ত এহ্দ ও শিগের গত্তাক, এনে সে ভিদেবো এহ্দ-উনো বাক্কন এলাক।


পুরোনি মুনিচ্ছোর-অ যে দাক্কো ইউরোপ-অত যেনেই বা বাইন্ন্যোন তারা সিদু  Evolve অইন্যেই  Homo neanderthalensis অইয়োন। তারারে উজু উজু  Neanderthal (নিয়ান্ডার্থাল) নাঙে দাগিই। ইউরেশিয়াত থেইয়ে Neanderthal-উন Ice Age(বরফ যুগ)-অর Climate-অত দরহ্ মরহ্ গরি Adapt ওই পাইজ্জোন। তারা Sapiens-অ ধারানে ক্যেয়েদি দাঙর আহ্ রদেবলে এলাক।

Neanderthal-উনোর চাঙসারা লুগানাত Sapiens-উনোর আহ্ত আগে ভিলিনে মনে গরা অয়। ৪০-অত্তুন ধরি ৬০আজার বজর আগলইত্ত্যে ইউরোপ ওত Homo sapiens-উন ভেদা দে ধজ্জোন। সে অক্তত Sapiens আহ্ Neanderthal-উন ধাগাধাক্যে থেইয়োন। খালিক Sapiens-উন Neanderthal-অ ধারানে বুদ্দিশুদ্দি বলা (Intelligent) অনায় আহ্দ’ বিদ্যেত দরহ্ মরহ্ ওই উত্তোন। তিগি থানাত্তেই Neanderthal আহ্ Sapiens-উনো ভিদিরে দাঙর competition লাগি যায়। Neanderthal-উন Sapiens-অ ধারানে পো’ছা ল’না/ফুদানাত কাবিল ন’এলাক। সে গদিয়ে Neanderthal-উনো ধারানে Sapiens বারিহ্ যেইয়োন। এনে এনে Neanderthal-উন তিগি থানা দুমুরোত Sapiens-উনোত্তুন অঘুর পিচ্ছে পজ্জোন। সে বাদেও Sapiens-উন Neanderthal-অ থেবার জানানি গজক গরি লো ধজ্জোন সে অক্তত। Neanderthal-উন অয় যেইয়োন অভা অভা কবা কবা। এনে এনে Sapiens-অ লগে তিগি নপারি Neanderthal-উন বজ গেলাক।


২০১০ সালত, সায়েন্টিস্ট’লগে সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা Island-অত এককোঅ গাদত এককোঅ মুনিচ্ছোর-অ আঙুলো Fossil পেইয়্যোন। Genetic analysis গরিনে দেঘা গেলহ্ সিভে এযাবত উদো পেইয়ে কনহ্ মুনিচ্ছোর-অ Spacies ওর নয়। নুঅ সুপ্ পেয়ে এ Species-অরে নাঙ থোয় দোন “Homo denisova”। কন্না খবর্ পায়, আর কধক মুনিচ্ছোর-অ Species-ও ফেলে যেইয়্যে মারা লুগি আগে কন গাদত, কন জারহ্ সেরে।


যকখে, ইউরোপ আর এশিয়াত মুনিচ্ছোর উনোর Evolution চলের, সেকখে পুগো আফ্রিকাত-ও Evolution-অ ছড়া শুগেই ন’যায়। মুনিচ্ছোর-অ মা জাগা’নে জনম দি যেয়্যে এককোঅ যেরে এককোঅ নুঅ নুঅ Species; Homo rudolfensis, Homo ergaster, বেগহ্ যেরে আমা Species, যিয়ুনে লাজন্যেয়ে গুরি আমা নাঙ থোয়েই Homo sapiens, জ্ঞানী মুনিচ্ছোর।


বিদি যেয়ে ১০আজার বজর ধরি, sapiens-উনে নিজোরে পিত্তিমিত বেরেয়্যে গাই এককোঅ মুনিচ্ছোর অর Species ইযেপ্যে দেঘি দেঘি এযান আক্কেঙ অইয়োন যে, যুদো কন বাবত্যে Possibility-র কল্পনা গরানা তারাত্ত্যেয় আগাত্ত্যে অইয়্যে। আমা মুনিচ্ছোর-উনোর যুদো Species-উনোর তিগি ন’থানা/ন’পারানা আন ইয়্যেন ধরি ল’দে যুত গরি দিয়্যে- আমি অত্ত্যেই এ সংসারর আগমলি, বাগিহ্ পরানবলা-উনোত্তুন আমি ব’জান যুদো!


চার্লস ডারউইনে যকখে কলধে Homo Sapiens-ও বাগিহ্ পরানবলা-উনো ধক এককোঅ পরানবলা বানাহ্, মুনিচ্ছোর-উনোত্তুন সেকখে আগুনে পানিয়ে রাগ উদি গেল্। এভসং, এক দাগিয়ে সে অত্তান গজি ল’বার ন’সান। যুনি Neanderthal-উনে তিগি যেদাক? সেকখেও  কি আমি আমারে বস্তু জগদত্তুন যুদো, Best Creation মনে গরিলোঙউন?


Homo Sapiens সিদি পত্ত্যে সলাত তারা মুওত পজ্জ্যে যুদো Species-উন ভজ যানা পিচ্ছে গদি ইযেবে কাম গইজ্জে কিজু বিষয়; Competitive Exclusion (সম্পত্তির প্রতিযোগিতা), Interbreeding, নুঅ রোগ ব্যাধি এ জাগাত আজল গদি ধরা যায়। 


বেগহ্ পইল্ল্যে, Competitive Exclusion-অ কধা ধরিলে আমি দেঘিদেই Sapiens-উন রদেবলে ন’অলেও আহ্দ’ বিদ্যেত দরহ্ মরহ্ অনায়, নানান বাবত্যে নুঅ নুঅ আত্ত্যের বানেদাক আর শিগের গরিবের নুঅ উবোয় নিগিলেই শিগের গত্তাক। থেবার জাগা কম অনায়, Climate বদলানা লগে লগে খানাদানার জুগোল এযানা আহ্ শিগেরত Sapiens অ লগে বুরেই ন’এযানায় যুদো Species-উন উবোয়সারা ওয় পজ্জোন। 


আহ্ বেগত্তুন অজার গদি ইযেপ্যে ধরি পারি Sapiens-অর লগে আন্যে নুঅ নুঅ ব্যাক্টেরিয়া আহ্ ভাইরাস অত্তুন অইয়্যে রোগ ব্যাধিনি, Sapiens-উন সে রোগকানিত তিগি থেবার অজন Adapt অলেও বাগিউনে সেনিত তিগি নপারন, সেনে Sapiens-উন তারা কুরে যানা লগে লগে বেজভাগ অসুগোত পরি মরি যেইয়্যোন। 

সে যেরে যকখে যুদো Species-উনো কুরেকাজে Sapiens উনে থা ধজ্জোন সেকখে তারা সিগুন্দোই বানা যুযধো ন’গরন, সে লগে লগে, সিগুন্দোই মিলিনেই পো’ছা লো ধজ্জোন (Interbreeding); এনেবাদে লুগি যাঙ যাঙ গরি থেইয়্যে মুনিচ্ছোর অ species-উন সিঙুরিনেই Sapiens-অ লগে মিজিনেই লুগি যেয়োন। এভসঙ আফ্রিকা বারে মুনিচ্ছোর-উনোর DNA-ত ১ - ২% Neanderthal-অ Gene, আহ্ এশিয়ার কিজু জাগার মুনিচ্ছোর-অ ভিদিরে Denisova-র Gene পা’যায়।


আহ্ আরেক্কান গদি ইযেবে ধরা যায় Sapiens-অর দরহ্ মরহ্ Communication skill। যেন কামত লাগেনেই তারা দলুন অদাক বিরেত বিরেত, সে জাগাত যুদো Species-উন থেদাক সিনেসিনন্যে, লাগা লাগা, দলত কম কম গরি।


Sapiens-অর দুজ থোক ন’থোক, বিজক ঘাদিনেই ইয়ান দেঘা যেইয়্যে- যকখে তারা নুঅ নুঅ জাগাত যেইয়্যোন সিত্তুন যুদো Spacies-উন চাংসারা লুঘি যেইয়্যোন। Homo soloensis-অর শেজ্ মাজারা পা’যায়দে ৫০আজার বজর আগলইত্ত্যে।  Homo denisova ভজ যেইয়্যোন সিত্তুন বজরমুলো যেরে। Neanderthal-উন Sapiens-অ লগে ন’তিগি বুরুজ উত্তোন ৩০আজার বজর আগলইত্ত্যে। Flores Island-অ বাক্কন্ন্যে দাগির চাঙসারা লুগি গেলহ্ ১২আজার বজর আগলইত্ত্যে। 


চাঙসারা লুগি যিয়ে মুনিচ্ছোর-অ Spacies-উনে ফেলে গেলাক কিজু আরকোরা, কিজু পাত্থর'অ আত্ত্যের, আমার DNA-ত কিজু Gene, আর ফেলে গেলাক অসাগর পুজোর, যিয়ানির কন মেত্ এভসঙ নেই। ফেলেই যেইয়্যোন পিত্তিমিত এগাতাত্যে মুনিচ্ছোর-অ Spacies, Homo Sapiens!